প্রারম্ভিকা

প্রস্তাবনা: একটি ক্ষতের বিস্তার ও ঈশ্বরের নির্বাসন

তুমি ছাড়া এই মহাবিশ্বে আমার আর কোনো প্রার্থনা ছিল না

৪ মিনিট পাঠ

মানুষ যখন কাউকে নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে ভালোবেসে ফেলে, তখন তার আর নতুন করে কোনো প্রার্থনার ভাষা তৈরি করতে হয় না। তার সমস্ত পূজা, সমস্ত পাপ এবং সমস্ত অপরাধ এসে ঠেকে একটি নির্দিষ্ট মুখমণ্ডলের রেখায়।

আমি বহু বছর ধরে নিজেকে বুঝিয়েছিলাম, জীবন মূলত একাকীত্বের। টেবিলের ওপর স্টোয়িক দার্শনিকদের বইগুলো সাজিয়ে রেখে আমি রাতভর নিজেকে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছি। ভাবতাম, যা আমার ছিল না, তা হারিয়ে ফেলার কোনো অধিকারও আমার নেই। শূন্যতাকে আলিঙ্গন করার ভান করে আমি আমার বন্ধুদের বলেছি, মানুষ একা এসেই শান্তিতে বাঁচে। শব্দহীনতার আড়ালে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছি সেই নাম, যা আমার গলার ভেতর শক্ত এক পাথরের মতো জমে উঠেছিল।

কিন্তু মাঝরাতে যখন এই শহরের সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায়, যখন ঘরে কোনো আলো থাকে না আর মুঠোফোনের নীল পর্দাটা নিভে গিয়ে অন্ধকারকে আরও কয়েক গুণ গাঢ় করে তোলে, তখন বুকের খাঁচায় হাত দিলে টের পাওয়া যায়, আমি কোনোদিন দার্শনিক হতে পারিনি। দর্শনের জন্ম হয় মস্তিষ্কের ক্লান্তিতে, আর প্রেম বেঁচে থাকে রক্তের শেষ লাল ফোঁটা পর্যন্ত। আমি কেবল একজন পরাজিত মানুষ, যে প্রতিদিন নিজের সাথে অভিনয় করে হেরে গেছে।

সবাই বলে ক্ষমা করে দেওয়া মহৎ গুণ। অথচ ঈশ্বরের প্রতি আমার রাগ কি কম ছিল? জন্মের পর থেকেই তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন অপ্রাপ্তি কাকে বলে। একটা ভাঙা নৌকার মতো তিনি আমাকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন অনন্ত এক ঝড়ে। প্রতিটি মোড়ে আমাকে নিঃস্ব করে দেওয়া হয়েছে, প্রতিটি ভরসার হাত শেষ পর্যন্ত শূন্যে মিলিয়ে গেছে। আমার সমস্ত সত্তা জুড়ে সেই অদৃশ্য স্রষ্টার বিরুদ্ধে এক পাহাড় সমান ক্ষোভ জমেছিল।

তারপর একদিন তুমি এলে। কোনো ঝড় তুলে নয়, কোনো নাটকীয় সংকেত দিয়ে নয়, হেমন্তের শেষ বিকেলে বাসের জানলা দিয়ে আসা একটা অলস আলোর মতো।

যেদিন প্রথম তোমার চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম, সেদিন টের পেয়েছিলাম এই পৃথিবীর সব কোলাহল কোথায় গিয়ে নিঃশব্দ হয়ে যায়। তুমি কথা বলছিলে খুব সাধারণ কোনো বিষয় নিয়ে, হয়তো রাস্তায় জ্যাম ছিল, কিংবা তোমার চশমার কাচটা বারবার ঘোলা হয়ে যাচ্ছিল। অথচ সেই সামান্য দৃশ্যটার দিকে চেয়ে আমার মনে হয়েছিল, ঈশ্বর যদি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করে আমাকে শুধু এক জীবনের অনন্ত নরকও উপহার দিতেন, তবুও শুধু তোমাকে এক পলক দেখার বিনিময়ে তাঁকে সব পাপ থেকে মুক্তি দেওয়া যেত।

আমি সেই বিকেলেই ঈশ্বরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম।

বাতাসে তখন শুকনো শিরীষ পাতার ওড়াউড়ি,
শহরের বুকে নেমে আসছিল ধীর, ধূসর গোধূলি।
তুমি চলে গেলে ট্রাফিকের ভেতর মিলিয়ে যাওয়া ছায়া হয়ে,
আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম শতাব্দী প্রাচীন এক ক্ষত বয়ে।

কতটা নদী শুকিয়ে গেলে তবে পাথর জন্ম নেয়?
কতটা রাত একা জাগলে মানুষ অন্ধকারের ভাষা শেখে?
তোমার চলে যাওয়ার পর আর কোনো ঋতু আসেনি এই দেশে,
শুধু কুয়াশা জমেছে আমার ছেঁড়া জামার পকেটে আর কপালে।

আমার কোনো অধিকার নেই তোমার ছায়াটুকু ছোঁয়ারও,
হাতে হাত রেখে পথ চলার কোনো মিথ্যে দাবি আমি তুলিনি।
তবু এই অবিনাশী শহরের সমস্ত ধুলোবালি জানে,
তুমি ছাড়া এই ধ্বংসস্তূপে আমার আর কোনো ঈশ্বর ছিল না।

আজ চারদিকে নিস্তব্ধতা নেমেছে। জানলার কাচে বাইরের ঠান্ডা কুয়াশা একটা পাতলা বাষ্পের স্তর তৈরি করেছে। আমি কাচের ওপর আঙুল দিয়ে কিছু একটা আঁকতে গিয়েও হাত গুটিয়ে নিই। জানি, কিছু নাম কোনোদিন প্রকাশ্যে লিখতে নেই। সেই নামগুলো রক্তের ভেতর নিঃশব্দে বয়ে চলাই তাদের নিয়তি।

আমি তোমাকে পাইনি। হয়তো কোনোদিন আর দূর থেকেও তোমাকে এক পলক দেখার সৌভাগ্য হবে না। কিন্তু তাতে ভালোবাসা মিথ্যে হয়ে যায় না। পাওয়ার ভেতর দিয়ে যা বাঁচে তা বড় নশ্বর; না-পাওয়ার অতল সমুদ্র পেরিয়ে যা টিকে থাকে, মূলত তা-ই অবিনশ্বর।

এই বই কোনো সান্ত্বনা খোঁজার জন্য নয়। এটি একজন প্রেমিকের নিজের অস্তিত্বের কাছে নতজানু হওয়ার দিনলিপি। যদি কোনো নিভৃত রাতে এই পাতাগুলো ওল্টাতে গিয়ে আপনার নিজের বুকের ভেতর পুরনো কোনো কাচ ভাঙার শব্দ শুনতে পান, তবে জানবেন, এই পৃথিবীতে ভালোবেসে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর দীর্ঘশ্বাস কোনোদিন মুছে যায় না।