অধ্যায় ১৫বৃষ্টিভেজা জানলার কাচ ও একটি আঙুল
অপেক্ষার কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র থাকে না
বৃষ্টির সময় জানলার কাচ কেমন এক অদ্ভুত মায়াবী ক্যানভাসে পরিণত হয়। ঘরের ভেতরের উষ্ণতা আর বাইরের হিমেল ঠান্ডার সংঘর্ষে কাচের ভেতরের পিঠে এক পাতলা বাষ্পের স্তর জমে ওঠে। বাইরের দুনিয়াটা তখন ঘোলাটে হয়ে যায়। দূরের গাছগুলো, ল্যাম্পপোস্টগুলো আর মানুষের ছাতাগুলো কেমন বিমূর্ত জলরঙের ছবির মতো দেখায়।
আমি জানলার সামনে এসে দাঁড়াই। আমার তর্জনীটা নিজের অজান্তেই উঠে আসে কাচের ওপর। বাষ্পের সেই ভেজা চাদরের ওপর আঙুল চালিয়ে আমি একটা অক্ষরের প্রথম দাগটা টানি। তারপর হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে হাতটা নামিয়ে নিই। না, পুরো নামটা লেখা যাবে না। এই ঘরের জড় কাচটাও যদি তোমার নাম জেনে ফেলে, তবে এই নিঃশব্দ একাকীত্বের গোপন মর্যাদাটুকু আর অবশিষ্ট থাকবে না।
অপেক্ষা মানুষকে কতটা নিঃস্ব করে দিতে পারে, তা যে কখনো কারো জন্য অপেক্ষা করেনি সে কোনোদিন বুঝবে না। বিশেষ করে যখন আপনি জানেন যে যার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে, সে কোনোদিন আসবে না। এই জানা সত্ত্বেও প্রতিটি দরজার কড়ার শব্দে, প্রতিটি ফোনের নোটিফিকেশনের টুংটাং আওয়াজে বুকের ভেতরটা কেমন লাফিয়ে ওঠে। যুক্তি বলে সে আসবে না, কিন্তু মূর্খ হৃদয় বলে হয়তো কোনো অলৌকিক ঘটনায় সে সব ফেলে ফিরে আসবে।
এই দোলাচলের ভেতর বেঁচে থাকা এক অবিরাম ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকার মতো। ফাঁসি হয়ে গেলে কষ্ট শেষ হয়ে যায়, কিন্তু ফাঁসির দড়ি গলায় পরে দাঁড়িয়ে থাকা এক অন্তহীন নরকযন্ত্রণা। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কাচের বাইরের পিঠে আঘাত করছে, আর একটা ফোঁটা অন্য আরেকটা ফোঁটার সাথে মিশে গিয়ে মোটা এক রেখা তৈরি করে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। ঠিক যেমন করে স্মৃতিগুলো আমার মস্তিষ্কে একে অপরের সাথে মিশে গিয়ে সমস্ত ভাবনাকে একাকার করে দেয়।
বাষ্প জমেছে জানলার কাচে, ঘোলাটে হয়েছে পৃথিবী বাইরে,
এমন বিষণ্ণ বাদল দিনে তোমায় না ভেবে কি পারা যায় রে?।
একটি আঙুল কেঁপে ওঠে কাচে তোমার নামটা লিখতে গিয়ে,
আমি পিছিয়ে আসি আবার আমার আজন্মের লজ্জা নিয়ে।কত ফোঁটা জল ঝরে গেল ওই আকাশ থেকে এই মাটির বুকে,
পৃথিবীর কোনো মানুষই বাঁচেনি তার পরম প্রেমে সুখে।
অপেক্ষা এক অনন্ত নদী, যার কোনো ঘাট নেই কোনো কূলে,
আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই নদীর পারে সমস্ত ঠিকানা ভুলে।কাচ ধুয়ে যায় জলের ধারায়, মুছে যায় বাষ্পের পাতলা স্তর,
তেমনি করে কি মুছে যাবে এই ব্যথিত হৃদয়ের চরাচর?।
না, জল তো কেবল কাচ ধোয়, দাগ তো রেখে যায় অন্তরে,
যে দাগ জ্বলবে চিরকাল আমার রক্তের শেষ অক্ষরে।
আমি জানলার পাল্লাটা একটু ফাঁক করে দিই। এক ঝলক ঠান্ডা ভেজা বাতাস আমার মুখে এসে আছড়ে পড়ে, আর কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির জল আমার চোখের পাতায় এসে লাগে। সেই জলটুকু কি বৃষ্টির, নাকি আমার নিজের চোখের জল, আমি বুঝতে পারি না। বোঝার কোনো প্রয়োজনও নেই। অশ্রু আর বৃষ্টির জলের রাসায়নিক উপাদান হয়তো ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু উভয়ের উৎস তো সেই মেঘেই, যা আকাশে জমলে বৃষ্টি হয় আর বুকে জমলে অশ্রু হয়ে ঝরে।
বৃষ্টি থেমে আসবে একসময়, আকাশ আবার পরিষ্কার হয়ে নীল আলো ছড়াবে। রোদ উঠবে শহরের বুকে, কাচের সমস্ত জল শুকিয়ে গিয়ে কাচটা আবার চকচক করবে। কিন্তু আমার ভেতরের এই মেঘ কবে কাটবে? কোনো আবহাওয়া দফতর তো এই মেঘের পূর্বাভাস দিতে পারে না। আমি জানলা বন্ধ করে দিই। অন্ধকার ঘরটায় আমি আবার একা বসে থাকি, আর কাচের গায়ে বাষ্পের সেই না-লেখা অক্ষরের দাগটা আমার চোখের সামনে ভাসতে থাকে।