অধ্যায় ৩১কোনো নালিশ নেই, কোনো অধিকারও নয়
ভালোবাসা যখন দাবি ছাড়িয়ে শান্ত নদীর মতো হয়ে ওঠে
নদী যখন পাহাড়ি খাদে থাকে, তখন সে পাথরে আছড়ে পড়ে গর্জন করে। সে গাছপালা উপড়ে ফেলে, দুই কুল ভেঙে তছনছ করে দেয়। কারণ তখন তার যৌবন থাকে, তখন তার ভেতরের দাবি থাকে প্রবল। কিন্তু সেই নদীই যখন সমতলে এসে সাগরের মোহনার কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন তার সমস্ত উদ্দামতা এক পরম শান্ত গভীরতায় রূপ নেয়। সে তখন আর কাউকে আঘাত করে না, সে কেবল নিঃশব্দে নিজের সমস্ত জলরাশিকে অনন্ত সাগরের চরণে ঢেলে দেয়।
আমার ভেতরের প্রেমও আজ সেই মোহনার শান্ত নদীর মতো হয়ে উঠেছে। একসময় আমার কত নালিশ ছিল। কেন তুমি এলে না? কেন তুমি আমার ভালোবাসার মর্যাদা দিলে না? কেন সমাজ আমাদের মাঝখানে অলঙ্ঘ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়াল? দিনের পর দিন আমি এই সমস্ত অভিযোগের তুষের আগুনে পুড়েছি। কিন্তু আজ যখন জীবনের সমস্ত হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দিয়েছি, তখন দেখছি আমার সমস্ত নালিশ বাতাসে মিলিয়ে গেছে।
দাবি ছাড়া যে ভালোবাসা বাঁচে, সে ভালোবাসাকে পৃথিবীর কোনো শক্তিই হত্যা করতে পারে না। আপনি যখন কারো কাছে কিছু চান না, এমনকী তার ভালোবাসাটুকুও ফেরত চান না, তখন আপনি এক পরম মুক্তির সাম্রাজ্যের সম্রাট হয়ে যান। আমার কোনো অধিকার নেই তোমার ওপর, কোনো সামাজিক আইনি স্বীকৃতি নেই। কিন্তু এই অনধিকারই তো আমার সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা।
অধিকার থাকলে হিসেব থাকে, দায়িত্বের ক্লান্তি থাকে, প্রতিদিন ভালোবাসা প্রমাণের বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু অনধিকারে কেবল থাকে এক নিঃস্বার্থ অঞ্জলি। আমি জানি তুমি কোনোদিন আমার হবে না, কিন্তু তাতে আমার ভালোবাসার তো কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হয় না। সূর্য কি কখনো হিসেব করে দেখে যে সে কোন কোন গাছে আলো দিচ্ছে? সে কেবল আলো দিয়ে যায়। আমিও কেবল ভালোবেসে যাব, কোনো প্রতিদান ছাড়া, কোনো দাবি ছাড়া।
মোহনার কাছে এসে নদী যেমন হয়ে যায় শান্ত ও গভীর,
তেমনি মুছে গেল আমার সমস্ত আজন্মের বোবা চোখের নীর।
কোনো নালিশ নেই আমার এই পৃথিবীর কোনো মানুষের কাছে,
যে ফুল ঝরে গেছে সেও তো পরম ভালোবাসার সৌরভে বাঁচে।অধিকারের শিকল ছিঁড়ে আমি আজ এক পরম মুক্ত পথিক,
ভালোবাসাই আমার ধ্রুবতারা, ভালোবাসাই আমার একমাত্র দিক।
দাবি না রেখে ভালোবাসাই তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দান,
যেখানে সমর্পণ করেছি আমার সমগ্র দেহ, আত্মা ও প্রাণ।সুখে থেকো তুমি তোমার ওই সাজানো নিভৃত আশ্রয়ে বসে,
আমি কেবল বেঁচে থাকব এই প্রেমের নিঃস্বার্থ রসে।
কোনোদিন কোনো অভিযোগ যাবে না তোমার দরজার কিনারায়,
আমার এই স্তব্ধতাই মিশে থাকবে তোমার চারপাশের ছায়ায়।
আমি আমার দুই হাত বুকের ওপর আলতো করে রাখি। কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো উত্তেজনা নেই। রক্তচাপ একদম স্বাভাবিক, হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হচ্ছে এক শান্ত ছন্দে। মানুষ যখন নিজের ক্ষুদ্র অহংকারকে বিসর্জন দিতে শেখে, তখন প্রকৃতি তার ভেতরে এক অলৌকিক নিস্তব্ধতা ঢেলে দেয়।
আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি, আমি নিজেকে ক্ষমা করে দিয়েছি, এবং সবচেয়ে বড় কথা আমি সেই মহাজাগতিক বিধানকে ক্ষমা করে দিয়েছি যা আমাদের মিলন হতে দেয়নি। এই ক্ষমার ভেতরেই রয়েছে আমার চূড়ান্ত বিজয়। যে মানুষ দাবিহীনভাবে ভালোবাসতে পেরেছে, তাকে এই পৃথিবীর কোনো বিচ্ছেদই আর নিঃস্ব করতে পারে না।