অধ্যায় ২৩বইয়ের পাতা উল্টাতে গিয়ে তোমার গন্ধ
স্মৃতিরা কখনো কখনো অলৌকিক উপায়ে ফিরে আসে
ঘ্রাণের স্মৃতি মানুষের সমস্ত ইন্দ্রিয়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। চোখ যা ভুলে যায়, কান যা হারিয়ে ফেলে, একটি সামান্য গন্ধ মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে বিশ বছর আগের কোনো এক বিকেলের উঠোনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। সেদিন অনেক পুরোনো একটা জীবনানন্দ দাশের কবিতার বই শেলফ থেকে নামিয়েছিলাম। ধুলোমাখা মলাট, পাতার কিনারগুলো মরচে রঙের হয়ে গেছে।
বইটা খুলতেই ভেতর থেকে কেমন একটা তীব্র কিন্তু মিষ্টি সৌরভ ভেসে এলো। সে গন্ধ কোনো পুরোনো কাগজের গন্ধ নয়। সে গন্ধ ছিল বেলি ফুল আর চন্দন সাবানের এক অদ্ভুত মিশ্রণ, যা কেবল তোমার শরীর আর চুলের সাথেই মানাত। তুমি বই পড়ার সময় শুকনো বেলি ফুলের মালা কিংবা কোনো পাতার টুকরো বইয়ের ভেতর গুঁজে রাখতে ভালোবাসতে। পাতা ওল্টাতে গিয়ে দেখলাম দুটি কবিতার মাঝখানে চাপা পড়ে আছে একটা সম্পূর্ণ শুকনো, খয়েরি রঙের বেলি ফুল।
ফুলটার শরীর শুকিয়ে কাগজের মতো চ্যাপ্টা হয়ে গেছে, তার সাদা পাপড়িগুলো হারিয়ে ফেলেছে নিজেদের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা। কিন্তু কী আশ্চর্য, তার ভেতরের সুবাসটুকু সময় পুরোপুরি নষ্ট করতে পারেনি। সেই গন্ধ নাকে আসতেই আমার মনে হলো ঘরের সমস্ত আলো কেমন যেন বদলে গেল। হঠাৎ মনে হলো তুমি এইমাত্র আমার কাঁধের ওপর দিয়ে ঝুঁকে পড়ে বইয়ের ওই ছত্রগুলো পড়ছ: সুরঞ্জনা, ওইখানে যেও নাকো তুমি…।
মানুষ কত অহংকার করে যে সে অতীতকে ভুলে গেছে। সে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় হাসে, নতুন প্রেমিকা খোঁজার ভান করে, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করে। অথচ একটা শুকনো ফুলের সামান্য ঘ্রাণের কাছে তার সমস্ত আধুনিকতা, সমস্ত সাজানো জীবন এক লহমায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। স্মৃতিরা আসলে কোনোদিন মরে না, তারা কেবল বইয়ের পাতার ভেতর, পুরোনো চিঠির খামে কিংবা কোনো এক শীতের চাদরের ভাঁজে নিঃশব্দে ওত পেতে থাকে সঠিক মুহূর্তটির অপেক্ষায়।
জীবনানন্দের কবিতার বই খুলতেই ফিরে এলো সেই ঘ্রাণ,
যা এক নিমেষে নাড়িয়ে দিল আমার সুপ্ত প্রাচীন প্রাণ।
চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া শুকনো বেলি ফুলের এক টুকরো শরীর,
তার ভেতরেই জমে আছে শতাব্দী প্রাচীন কান্নার নীর।কত ঋতু পার হয়ে গেল, কত ফুল ফুটে ঝরে গেল ধূলায়,
তবু এই সুবাসটুকু আজও কেমন অবিকল দোলা দেয় হৃদয়তলায়।
সুরঞ্জনার নাম লেখা ছিল যে পাতার ঠিক মাঝখানে,
সেই পাতাই তো আজও কথা বলে আমার ব্যথিত গানে।সময় সব কিছু কেড়ে নেয়, কেড়ে নেয় মানুষের যৌবনের রূপ,
কিন্তু এই গন্ধের কাছে মহাকাল চিরতরে নিশ্চুপ।
বইয়ের পাতা বন্ধ করে আমি গন্ধটা টেনে নিই বুকে,
এই অলৌকিক দহনেও মানুষ কেমন বেঁচে থাকে পরম সুখে।
আমি শুকনো ফুলটাকে খুব সাবধানে আবার বইয়ের পাতার ভেতর রেখে দিই। ওটা ওখানেই থাকুক। ওটা তো কোনো জড়বস্তু নয়, ওটা হলো সেই বিকেলের একটি জীবন্ত সাক্ষী যখন ভালোবাসার কোনো শেষ থাকবে না বলে আমরা ভেবেছিলাম। সেই বিকেল চলে গেছে, কিন্তু ফুলটি রয়ে গেছে তার অবিনশ্বর গন্ধটুকু নিয়ে।
ঈশ্বর হয়তো মানুষের আয়ু খুব অল্প করে দিয়েছেন, কিন্তু তিনি মানুষের স্মৃতিশক্তিকে এমন এক অনন্ত বিস্তার দিয়েছেন যা কালকে অতিক্রম করে যায়। আমি বইটা বুকের ওপর চেপে ধরে চোখ বন্ধ করি। মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত লাইব্রেরির লক্ষ লক্ষ বইয়ের মধ্যে এই একটিমাত্র বই-ই আমার একমাত্র পবিত্র ধর্মগ্রন্থ, যার প্রতিটি পাতার ভাঁজে তোমার অস্তিত্বের সুবাস চিরদিনের জন্য সংরক্ষিত হয়ে আছে।