পর্ব ৩: দর্শনের পরাজয় ও প্রেমের উন্মেষ

অধ্যায় ২২শূন্যতা দিয়ে ক্ষত ঢাকা যায় না

নিজেকে ভুলিয়ে রাখার সমস্ত আত্মপ্রবঞ্চনা

৫ মিনিট পাঠ

কিছু মানুষ মনে করে ঘর থেকে সমস্ত আসবাবপত্র বের করে দিলেই ঘরটা পবিত্র হয়ে যায়। তেমনিভাবে আমি ভেবেছিলাম, হৃদয় থেকে তোমার সমস্ত স্মৃতি মুছে ফেলে যদি সেখানে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করে রাখা যায়, তবে আর কোনোদিন কোনো নতুন ক্ষত তৈরি হবে না। আমি নিজেকে সম্পূর্ণ অনুভূতিহীন এক কাঠের পুতুলে পরিণত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম।

কারো সাথে ভালো করে কথা বলতাম না, কোনো উৎসবের নিমন্ত্রণে যেতাম না, এমনকী আকাশ মেঘলা হলে জানলা বন্ধ করে দিতাম যেন বৃষ্টির গন্ধ আমার নাকে না আসে। ভাবতাম এই যে নির্বাসিত শূন্যতা, এটাই আমার বর্ম। এর গায়ে কোনো তীরের আঘাত লাগবে না। কিন্তু মানুষের হৃদয় কোনো শূন্য ঘর নয় যেখানে বাতাসও ঢুকতে পারে না। হৃদয় হলো এক জীবন্ত বাগান, আপনি সেখানে সুগন্ধি ফুলের চাষ না করলে সেখানে বিষাক্ত আগাছা জন্মাবেই।

শূন্যতা কখনো কোনো ক্ষতের উপশম হতে পারে না। বরং শূন্যতার ভেতরে ক্ষতটা আরও বেশি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। যখন চারপাশে কোনো আলো থাকে না, কোনো শব্দ থাকে না, তখন ক্ষতের মুখ থেকে যে নিঃশব্দ রক্তক্ষরণ হতে থাকে, তার তীব্র গন্ধ পুরো অস্তিত্বকে বিষাক্ত করে তোলে। আমি আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠতাম। মনে হতো দুটো অন্ধকার কুয়োর ভেতর থেকে এক ক্ষুধার্ত পিশাচ আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

নিজেকে ভুলিয়ে রাখার এই সমস্ত আত্মপ্রবঞ্চনা আসলে এক ধরনের আত্মহত্যার নামান্তর। মানুষ যখন নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করতে চায়, তখন সে আসলে নিজের মানবতাকেই হত্যা করে। আমি চেয়েছিলাম বেঁচে থেকেও মরে থাকতে, যেন কোনো ব্যথাই আমাকে আর ছুঁতে না পারে। কিন্তু জীবনের দাবি যে মৃত্যুর চেয়েও বড়। একদিন বুকের ভেতর এমন এক তীব্র হাহাকার জেগে উঠল যে মনে হলো পাথর ফেটে জল বেরিয়ে আসছে।

শূন্যতা দিয়ে ঢাকতে চেয়েছিলাম বুকের ভেতরের রক্তক্ষরণ,
ভেবেছিলাম অনুভূতিহীন হয়েই বরণ করব আমার মরণ।
আসবাবহীন ঘরের মতো সাজিয়েছিলাম আমার হৃদয়খানি,
যেন কোনো স্মৃতি আর ফিরে এসে না ফেলে এক ফোঁটাও পানি।

কিন্তু শূন্যতা তো নিজেই এক প্রকাণ্ড কালো দৈত্যের মায়াজাল,
যার অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে মানুষের আদিম চিরকাল।
ক্ষতের মুখে পাথর চাপা দিলে কি আর যন্ত্রণা কমে যায়?
সে যে আরও গভীর সুড়ঙ্গ কেটে রক্তের ভেতরে বিষ ছড়ায়।

স্বীকার করলাম আজ আমার সমস্ত কাপুরুষতা আর ভয়,
শূন্যতার কাছে কোনোদিন মানুষের কোনো মুক্তি হয় না জয়।
ক্ষত থাকুক আমার বুকে অমলিন এক গোলাপের মতো ফুটে,
আমি বাঁচব এই যন্ত্রণাকে ভালোবেসেই সমস্ত অহংকার টুটে।

আমি বুঝতে পারলাম, ক্ষতকে ভালোবাসতে শিখতে হবে। যে ক্ষতের জন্ম হয়েছে তোমার মতো এক অপূর্ব মানবীকে ভালোবেসে, তাকে কেন আমি অস্বীকার করব? সে তো কোনো অপমানের দাগ নয়, সে তো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তির রাজটিকা। এই ক্ষতটাই তো প্রমাণ করে যে আমি বেঁচে ছিলাম, আমি ভালোবেসেছিলাম, আমি এক নশ্বর জীবনে অনন্তের ছোঁয়া পেয়েছিলাম।

আজ আমি আর শূন্যতার ভান করি না। যদি কষ্ট হয়, আমি কষ্ট পেতে রাজি আছি। যদি রাতে ঘুম না আসে, আমি তোমার স্মৃতিগুলোকে এক এক করে ডেকে এনে তাদের সাথে কথা বলব। ক্ষতকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, ক্ষত তো সেই আলো যা দিয়ে মানুষ অন্ধকারের ওপারে দেখতে শেখে। আমি সেই ক্ষতের আলোতেই আমার বাকি পথের নকশা এঁকে নিই।