পর্ব ৩: দর্শনের পরাজয় ও প্রেমের উন্মেষ

অধ্যায় ২৭শহরের শেষ বাতি যখন নিভে যায়

অন্ধকারের সাথে এক নিভৃত বোঝাপড়া

৫ মিনিট পাঠ

ভোর চারটার দিকে যখন এই শহরের রাস্তার শেষ সোডিয়াম বাতিটাও নিভে যায়, তখন যে অন্ধকারটা নেমে আসে, তা কোনো সাধারণ অন্ধকার নয়। সে এক নীলচে, ঘন আর স্তব্ধ অন্ধকারের চাদর। সারাদিন যে সমস্ত আলো মানুষকে বিভ্রান্ত করে রেখেছিল, তারা সবাই তখন ছুটি নেয়। সেই অন্ধকারে চোখ সয়ে গেলে বোঝা যায়, আলো আসলে কত মিথ্যা জিনিস ছিল। আলো কেবল বস্তুর ওপরের আবরণটা দেখায়, আর অন্ধকার দেখায় তার ভেতরের আসল রূপ।

আমি আমার ঘরের জানলার পাল্লা দুটো সম্পূর্ণ খুলে দিই। ঘরের ভেতর ঠান্ডা হাওয়া ঢুকে পড়ে, আর সাথে নিয়ে আসে রাতের সেই পরম নিস্তব্ধতা। এই সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয় গোটা ব্রহ্মাণ্ডে আমি ছাড়া আর কোনো জীবিত প্রাণী জেগে নেই। এক অদ্ভুত নিভৃত বোঝাপড়া তৈরি হয় এই অন্ধকারের সাথে। সে আমাকে ভয় দেখায় না, সে আমাকে তিরস্কার করে না। সে এক পরম মমতাময়ী মায়ের মতো আমার সমস্ত ক্লান্তি আর ক্ষতের ওপর নিজের শীতল হাত বুলিয়ে দেয়।

এই অন্ধকারে বসে আমি তোমার সাথে কথা বলি। দিনের আলোয় যা বলা যায় না, লোকলজ্জার ভয়ে যা মুখে আনা অসম্ভব, অন্ধকারের গভীরে সেই সমস্ত কথা খুব সহজ হয়ে যায়। আমি বলি, জানো, আমি তোমাকে কোনোদিন দোষ দিইনি। আমি জানি তুমিও তোমার পরিস্থিতির কাছে বন্দি ছিলে। আমরা সবাই তো এক একটা ট্র্যাজেডির পুতুল, নিয়তি যে সুতো নাড়ায় আমরা সেভাবেই নাচতে বাধ্য হই।

অন্ধকার মানুষের ক্ষোভকে ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়। আলোর ভেতরে যে অহংকার চকচক করে, অন্ধকারের অতল গহ্বরে সে নিজের অসারতা বুঝতে পারে। আমি বুঝতে পারি, আমার ঈশ্বরকে ক্ষমা করার সময় এসে গেছে। যে ঈশ্বর আমাকে এত দুঃখ দিয়েছেন, তিনি তো আমাকে তোমার মতো এক মানবীকে দেখার সুযোগও দিয়েছিলেন। এক জীবনে এইটুকুই কি কম? কোটি কোটি মানুষ তো এই পৃথিবীতে জন্মায় আর মরে যায় ভালোবাসা কী তা না জেনেই। আমি অন্তত সেই মহাজাগতিক অনুভূতির আগুনে পুড়ে খাঁটি হতে পেরেছি।

শহরের শেষ বাতি নিভে গেল ওই দূরের কুয়াশাচ্ছন্ন মোড়ে,
আমি একা বসে আছি অন্ধকারের নিভৃত চাদরটি ওড়ে।
কোনো আলো নেই এই ঘরে, নেই কোনো মিথ্যে ভনিতার বালাই,
আমি স্মৃতির অঙ্গারে হাত রেখে নতুন করে আগুন জ্বালাই।

কত ক্ষোভ ছিল একদিন এই বুকে, কত শত নালিশের পাহাড়,
অন্ধকারের শীতল স্পর্শে মুছে গেল সব বিষাক্ত আহার।
তুমি তো নির্দোষ ছিলে, নির্দোষ ছিল এই নিষ্ঠুর মহাকাল,
আমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়েছিল কেবল এক দুর্লঙ্ঘ্য দেওয়াল।

বাতি নিভে গেছে ভালোই হয়েছে, ঘুচেছে চোখের সমস্ত ক্লান্তি,
অন্ধকারের এই অতল গভীরে নেমে এলো এক পরম শান্তি।
ক্ষমা করে দিলাম সবাইকে আজ এই নিস্তব্ধ ভোরের ক্ষণে,
শুধু তোমার স্মৃতিটুকু অমলিন আলো হয়ে জ্বলুক আমার মনে।

পূব আকাশে তখন ভোরের প্রথম আলোর রেখা ফুটতে শুরু করেছে। রাতের সেই পরম শান্তি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যেতে চলেছে। আবার শুরু হবে মানুষের কোলাহল, আবার শুরু হবে বেঁচে থাকার নিষ্ঠুর লড়াই। কিন্তু আমার ভেতরের মানুষটি আজ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সে আর সেই আগের বিক্ষুব্ধ, বিদ্রোহী মানুষটি নেই।

অন্ধকার আমাকে ক্ষমা করতে শিখিয়েছে। সে আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে নিজের সমস্ত দহনকে শান্ত এক হাসিতে রূপান্তর করতে হয়। আমি জানলার গ্রিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াই। দিনের আলো আসুক, আমি তাকে ভয় পাই না। যার বুকের ভেতর নিজের এক অনন্ত বাতিদান জ্বলছে, বাইরের কোনো আলো বা অন্ধকার তাকে আর নতুন করে কোনো ক্ষতি করতে পারে না।