পর্ব ৪: ক্ষমা ও অনন্ত সমর্পণ

অধ্যায় ৩৯অন্ধকারের শেষ বাতিদানে শুধু তুমি

মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও যে আলো কোনোদিন নেভে না

৫ মিনিট পাঠ

চারপাশের সমস্ত আলো যখন একে একে নিভে যায়, যখন জীবনের সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ হয়ে আসে, তখন মানুষের চেতনার শেষ সীমানায় কী অবশিষ্ট থাকে? মৃত্যুর আগে মানুষ কী দেখে? বিজ্ঞানীরা বলেন মস্তিষ্ক তখন তার সমস্ত সংরক্ষিত স্মৃতির স্লাইডগুলো এক সেকেন্ডে চোখের সামনে ঘুরিয়ে আনে। সেই স্লাইডে কি কোনো ধনসম্পদের ছবি থাকে? কোনো পদক বা খ্যাতির ছবি থাকে? না, সেখানে কেবল থাকে ভালোবাসার মানুষের মুখ।

আমার ঘরের বাতিটা অনেক আগেই নিভে গেছে। শহরের সমস্ত বাতিও নিভে গেছে। এক অনন্ত আদিম অন্ধকার আমার চারপাশকে গ্রাস করে নিয়েছে। কিন্তু সেই ঘন অন্ধকারের ঠিক মাঝখানে, আমার অন্তরের শেষ বাতিদানে একটিমাত্র শিখা অবিচলভাবে জ্বলছে। সেই শিখায় কোনো ধোঁয়া নেই, কোনো কাঁপন নেই। সে এক পরম স্নিগ্ধ সোনালী আলো, আর সেই আলোর কেন্দ্রবিন্দুতে জ্বলজ্বল করছে কেবল তোমার মুখ।

এই আলো কোনোদিন নিভবে না। বাতাস যতই তীব্র হোক, ঝড়ের গর্জন যতই ভয়ংকর হোক, এই শিখাটির গায়ে কোনো আঁচড় লাগাতে পারবে না। কারণ এই বাতিটি কোনো তেল বা সলতে দিয়ে জ্বালানো হয়নি, এটি জ্বালানো হয়েছে আমার সারা জীবনের সমস্ত দহন আর আত্মত্যাগের পবিত্র রস দিয়ে। এটি সেই অমর আলো যা মৃত্যুর ওপারেও মানুষের আত্মাকে পথ দেখায়।

আমি সেই আলোর দিকে তাকিয়ে শান্তিতে চোখ বন্ধ করি। মনে হয় আমি কোনো অন্ধকার ঘরে নেই, আমি দাঁড়িয়ে আছি এক অনন্ত নক্ষত্রখচিত আকাশের নিচে। তুমি আমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছো, কোনো কথা না বলে কেবল শান্ত এক হাসিমুখে। সমস্ত পার্থিব যন্ত্রণা, সমস্ত বিচ্ছেদের হাহাকার এক নিমেষে কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেছে। কেবল রয়ে গেছে এই আলো, আর আমাদের এই অবিনাশী সংযোগ।

সমস্ত বাতি নিভে গেল একে একে এই পৃথিবীর শেষ রাতে,
শুধু তোমার আলোটি জ্বলে রইল আমার এই অন্তরের সাথে।
অন্ধকারের শেষ বাতিদানে তুমি আছো এক চিরন্তন শিখা,
যার আলোয় লেখা হয়ে গেছে আমার সমস্ত নিয়তির শুভ টিকা।

কোনো মৃত্যু নেই এই প্রেমের, নেই কোনো বিনাশের কালো ছায়া,
মহাকালের ওপারেও বেঁচে থাকবে আমাদের এই পবিত্র মায়া।
ঝড় আসুক, তছনছ হয়ে যাক সারা বিশ্বের সমস্ত আয়োজন,
এই আলোতেই মুক্তি পাবে আমার আজন্মের অতৃপ্ত মন।

আমি নতজানু হয়ে প্রণাম জানাই এই অবিনশ্বর শিখার চরণে,
ভালোবেসে আমি জয় করে নিলাম জীবনের সমস্ত সংকট ও মরণে।
তুমি ছাড়া আর কোনো আলো ছিল না এই মাটির পৃথিবীতে কোথাও,
তোমার আলোতেই ভেসে চলল আমার অনন্ত মুক্তির শেষ নাও।

আমি সেই শিখাটিকে বুকের ভেতর ধারণ করে নিলাম। এবার আর কোনো অন্ধকারের ভয় নেই। যে মানুষ নিজের ভেতরে এই চিরন্তন বাতিটি জ্বালিয়ে নিতে পেরেছে, তাকে নরকের অন্ধকারও আর কোনোদিন স্পর্শ করতে পারে না।

ভোরের আলো ফোটার আর বেশি বাকি নেই। এই ভোরের সাথে সাথেই শেষ হবে আমার এই দীর্ঘ কাব্যিক দিনলিপি। কিন্তু এই দিনলিপির প্রতিটি অক্ষরের ভেতর দিয়ে সেই বাতিদানের আলো যুগ যুগ ধরে জ্বলতে থাকবে। যদি কোনো নিঃস্ব প্রেমিক কোনোদিন এই লেখাগুলো পড়ে, তবে সেও নিজের ভেতরের বাতিটি খুঁজে পাবে। সেই বিশ্বাসের ওপর ভর করেই আমি শেষ অধ্যায়ের দিকে পা বাড়াই।