পর্ব ২: কুয়াশা, স্মৃতি ও অসমাপ্ত কথন

অধ্যায় ১৬ট্রেন ছাড়ার শেষ হুইসেল

স্থায়ী বিচ্ছেদের মুহূর্তে কোনো নাটকীয়তার প্রয়োজন হয় না

৫ মিনিট পাঠ

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের বিশাল ছাদটার নিচে মানুষের ভিড় আর ট্রেনের চাকার আওয়াজ এক দানবীয় গমগম শব্দ তৈরি করছিল। প্ল্যাটফর্মের ধুলোমাখা বাতাসে ডিজেলের পোড়া ধোঁয়া আর চানাচুরের গন্ধ ভাসছিল। ট্রেনের ধাতব বগিগুলোর গায়ে লাল হরফে লেখা ছিল গন্তব্যের নাম। সেই নামটা আমার কাছে কোনো ভৌগোলিক শহরের নাম ছিল না, সেই নামটা ছিল এক স্থায়ী নির্বাসনের দ্বীপ।

তুমি উঠে দাঁড়িয়েছিলে কামরার দরজার লোহার হাতলটা ধরে। চারপাশে কত মানুষ আত্মীয়-স্বজনকে বিদায় জানাতে এসে জড়িয়ে ধরছে, আশীর্বাদ করছে, হাসছে। অথচ আমরা দুজন দাঁড়িয়েছিলাম একেবারে নিঃশব্দে। আমাদের কোনো হাত মেলানো ছিল না, কোনো বিদায় সম্ভাষণ ছিল না। যখন সবকিছু শেষ হয়ে যায়, তখন মানুষ নাটকের অভিনেতাদের মতো সংলাপ আওড়াতে পারে না। সংলাপ ফুরিয়ে গেলেই তো আসল জীবনের নিষ্ঠুরতা শুরু হয়।

হঠাৎ ট্রেনের ইঞ্জিনের তীক্ষ্ণ, কানফাটানো হুইসেলটা বেজে উঠল। সেই আওয়াজটা যেন আমার কানের পর্দা ভেদ করে মস্তিষ্কের গভীরে গিয়ে আঘাত করল। গার্ডের সবুজ বাতি জ্বলে উঠল, আর লাল রঙের লোহার দানবটা এক বিশাল ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল। তুমি কামরার ভেতরে ঢুকে গেলে না, তুমি দরজায় দাঁড়িয়েই রইলে। তোমার মুখটা ধীরে ধীরে গতি বাড়াল, লোহার রেললাইনের চাকার ঘটাং-ঘটাং শব্দ এক অবিরাম আর্তনাদের মতো প্ল্যাটফর্ম জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল।

আমি প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত হেঁটে গেলাম। যেখানে প্ল্যাটফর্মের সিমেন্ট শেষ হয়ে গেছে আর নুড়িপাথরের রেললাইন বাঁক নিয়েছে অন্ধকারের ভেতর, সেখানে গিয়ে আমি দাঁড়ালাম। ট্রেনের পেছনের লাল বাতিটা ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে একসময় রাতের অন্ধকারের ভেতর পুরোপুরি মিলিয়ে গেল। তখন স্টেশনের সেই বিশাল কোলাহলটাও আমার কাছে কেমন এক মৃত স্তব্ধতার মতো মনে হতে লাগল।

স্টেশনের ভিড়ে বেজে উঠল ট্রেনের শেষ হুইসেল তীব্র সুরে,
তুমি চলে গেলে চিরদিনের মতো এই পোড়া জীবন থেকে দূরে।
লোহার চাকার ঘর্ষণে কেঁপে উঠল গোটা প্ল্যাটফর্ম আর মাটি,
ভেঙে চুরমার হয়ে গেল আমার এই অহংকারী মন খাঁটি।

কত কথা বলার ছিল, অথচ বলা হলো না কোনো সংলাপ,
বিদায়ের মুহূর্তে জমে রইল কেবল আদিম নীরব অভিশাপ।
লাল বাতিটা নিভে গেল ওই দূরের কুয়াশাচ্ছন্ন বাঁকে,
কে আর ভালোবাসবে বলো এমন নিঃস্ব একাকী আমাকে?।

প্ল্যাটফর্ম শূন্য হয়ে গেল, সবাই ফিরে গেল আপন ঘরে,
শুধু আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম অনন্ত এক শূন্যতা ধরে।
যে ট্রেন চলে গেছে সে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না কোনো স্টেশনে,
তার চাকার দাগ আঁকা রইল আমার আজন্মের ব্যথিত মনে।

মানুষ কীভাবে এত সহজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যায়? একটা টিকিট কেটে সিটে বসে পড়লেই কি অতীতের সমস্ত দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায়? হয়তো যায়। যারা চলে যায় তাদের পথ সহজ, কিন্তু যে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকে তার কাছে প্রতিটি রেললাইন এক একটা ফাঁসিকাঠের দড়ি হয়ে ঝুলে থাকে।

আমি ধীরপায়ে স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় তখন রিকশাওয়ালারা যাত্রীদের জন্য হাঁকাহাঁকি করছে, বাদামওয়ালারা কাচের বয়াম বাজিয়ে বিক্রি করছে। জীবন তার স্বাভাবিক গতিতে বহমান, কারো ট্রেন ছুটে যাওয়ার কারণে এই পৃথিবীর এক ফোঁটাও সময় নষ্ট হয় না। আমি পকেটে হাত ঢুকিয়ে শহরের রাতের অন্ধকারের ভেতর মিশে গেলাম। কিন্তু কানের ভেতর সেই তীক্ষ্ণ হুইসেলের প্রতিধ্বনি আজও বন্ধ হলো না।