পর্ব ১: রক্তমাংসের পরাজয় ও গোপন ক্ষত

অধ্যায় ০২ব্যালকনির মরচে পড়া গ্রিল ও কাচের চুড়ির ঘ্রাণ

মধ্যরাতের বাতাসে তোমার অস্তিত্বের অমোঘ উপস্থিতি

৫ মিনিট পাঠ

আমাদের পুরোনো ভাড়াবাড়ির চারতলার ব্যালকনিটা ছিল আমার একমাত্র মুক্তির জায়গা। সেখানে একটা ভাঙা বেতের চেয়ার পাতা থাকত, আর রেলিংয়ের মরচে পড়া লোহার রডগুলো শীতের রাতে অসম্ভব ঠান্ডা হয়ে যেত। সেই ব্যালকনিতে দাঁড়ালে নিচের অন্ধকার গলির ল্যাম্পপোস্টটা দেখা যেত, যার চারপাশে কয়েকটা অন্ধ পোকা অবিরাম চক্কর খেত আর আগুনে পুড়ে মরত।

সেই ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোর দিকে তাকিয়ে আমি কত শত রাত কাটিয়ে দিয়েছি, তার কোনো হিসেব আমার কাছে নেই। মানুষ যখন অত্যন্ত নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে, তখন সে জড়বস্তুর সাথে কথা বলতে শেখে। আমি রেলিংয়ের ঠান্ডা লোহাটায় কপাল ঠেকিয়ে রাখতাম, যেন সেই ঠান্ডা লোহা আমার মাথার ভেতরে জ্বলতে থাকা স্মৃতির আগুনটাকে একটু হলেও জুড়াতে পারে। কিন্তু লোহা গরম হয়ে যেত, ভেতরের আগুন একটুও কমত না।

একদিন সন্ধেবেলা তুমি এই ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছিলে। তোমার হাতে ছিল দুটো নীল কাচের চুড়ি, আর বাতাসে উড়ছিল তোমার এলোমেলো চুলের কয়েকটা অবাধ্য গোছা। তুমি রেলিং ধরে নিচে তাকিয়ে বলেছিলে, এই শহরটাকে এত ওপর থেকে দেখলে সব মানুষকে কেমন পিঁপড়ের মতো ছোট মনে হয়, তাই না? আমি তোমার দিকে তাকিয়েছিলাম, শহরের দিকে নয়। আমার মনে হয়েছিল, নিচের পৃথিবীটা যদি মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে ছাই হয়ে যায়, তবুও আমার কিছু যায় আসে না, যদি এই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তোমার হাতের চুড়ির শব্দটুকু চিরকাল শোনা যায়।

সেই বিকেলটা শেষ হয়েছিল খুব দ্রুত। তুমি চলে গিয়েছিলে, কিন্তু তোমার হাতের চুড়ির ঠুনঠুন শব্দ আর তোমার শ্যাম্পু করা চুলের গন্ধটা সেই মরচে পড়া রেলিংয়ের গায়ে আজও যেন লেগে আছে। কত বছর কেটে গেল, সেই বাড়িওয়ালা বাড়িটা ভেঙে হয়তো নতুন কোনো বহুতল বানাবে, কিন্তু মহাবিশ্বের কোনো এক কোণে সেই বিকেলের বাতাসটা কি আজও অক্ষত নেই? আমি বিশ্বাস করি, যা সত্যি সুন্দর, তা কোনোদিন পুরোপুরি ধ্বংস হতে পারে না।

রেলিংয়ে জমেছে মরচে আর শ্যাওলা পড়া স্মৃতি,
বাতাসে ভেসে আসে তোমার ফেলে যাওয়া সেই চেনা গীতি।
একজোড়া কাচের চুড়ি বেজে উঠেছিল এই নির্জনে,
তার অনুরণন আজও রয়ে গেছে আমার ব্যথিত মনে।

কত ঋতু এসে চলে গেল এই শূন্য বারান্দা দিয়ে,
কেউ তো আর তাকায় না কোনো অলৌকিক মায়া নিয়ে।
শুধু আমি একা দাঁড়াই সেই পুরোনো ছায়ার পাশে,
আজও কি তোমার নিঃশ্বাস এই শীতল বাতাসে ভাসে?

হারিয়ে যাওয়ার ভয় যার থাকে সে তো কোনোদিন ভালোবাসেনি,
আমি তো তোমায় ভালোবেসে কোনো নিরাপত্তা চাইনি।
ধ্বংসের শেষ কিনারে দাঁড়িয়েও যে নাম মুখে আসে,
সেই নাম মিশে আছে ব্যালকনির নিভৃত ঘাসে।

এখন চারপাশ সম্পূর্ণ চুপচাপ। আমি অন্ধকারের ভেতর হাত বাড়িয়ে সেই পুরোনো রেলিংয়ের শূন্যস্থানটা স্পর্শ করার চেষ্টা করি। আঙুলের ডগায় শুধু জমে থাকা ধুলো আর হিম লেগে থাকে। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেই মনে হয়, আমার চামড়ার ঠিক নিচে এক অচেনা উষ্ণতা বয়ে চলেছে। সে উষ্ণতা তোমার অস্তিত্বের।

তুমি নেই, কিন্তু তোমার এই অনুপস্থিতিই তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সঙ্গী। যা চোখের সামনে থাকে তা তো স্থান দখল করে, কিন্তু যা কোথাও নেই তা সমস্ত শূন্যতা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ঈশ্বর হয়তো চেয়েছিলেন আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে নিজের ক্ষমতা জাহির করতে। কিন্তু আমি যখন এই অন্ধকার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তোমার চুড়ির ঘ্রাণ পাই, তখন আমার মনে হয়, ঈশ্বরের সমস্ত স্বর্গ মিলেও এই একটি স্মৃতির চেয়ে বেশি আলো দিতে পারত না। আমি রেলিং ছেড়ে ভেতরে আসি, কিন্তু মনটা পড়ে থাকে সেই বিকেলের বাতাসে।