পর্ব ৪: ক্ষমা ও অনন্ত সমর্পণ

অধ্যায় ৩৫ক্ষমা এক অলৌকিক নিস্তব্ধতা

সমস্ত ক্ষোভ আর যন্ত্রণাকে নিঃশব্দে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া

৫ মিনিট পাঠ

প্রতিশোধ নেওয়া খুব সহজ। রাগ পুষে রাখা, অভিশাপ দেওয়া আর কাউকে নিজের সারা জীবনের দুঃখের জন্য দায়ী করা মানুষের সবচেয়ে আদিম ও নীচ প্রবৃত্তি। এতে কোনো শক্তির প্রয়োজন হয় না, দুর্বল মানুষেরাও এই কাজ অনায়াসে করতে পারে। কিন্তু ক্ষমা করার জন্য যে কী অবিশ্বাস্য মানসিক শক্তির প্রয়োজন হয়, তা যে কোনোদিন কাউকে ক্ষমা করেনি সে কল্পনাও করতে পারবে না।

ক্ষমা কোনো মৌখিক বাক্য নয়। সে কেবল মুখে বলে দেওয়া যায় না যে আমি তোমাকে ক্ষমা করলাম। ক্ষমা হলো ভেতরের সমস্ত বিষাক্ত সাপগুলোকে এক এক করে নিজের হাত দিয়ে বাইরে বের করে দেওয়া। সে এক অলৌকিক নিস্তব্ধতা, যা নেমে এলে মানুষের বুকের ভেতরের সমস্ত সাইরেনের শব্দ এক নিমেষে বন্ধ হয়ে যায়। তখন আর কোনো শত্রু থাকে না, কোনো প্রতারক থাকে না, থাকে কেবল একদল বিভ্রান্ত মানুষ যারা নিজেদের অজ্ঞতার কারণেই অন্যকে কষ্ট দিয়েছে।

আমি বুড়িগঙ্গার তীরের এক পুরোনো শ্মশানঘাটের সিঁড়িতে বসেছিলাম। রাত তখন অনেক। নদীর কালো জলের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল কিছু পচা কচুরিপানা আর দূরে কোনো জাহাজের মৃদু আলো। আমি আমার বুকের ভেতর হাতড়ে দেখলাম, কোথাও কি কোনো ক্ষোভের অবশিষ্ট কণা রয়ে গেছে? না, কোথাও কিচ্ছু নেই। যে আগুন একদিন আমাকে পাগল করে দিত, তা আজ সম্পূর্ণ নিভে একরাশ ঠান্ডা ছাইয়ে পরিণত হয়েছে।

আমি সেই ছাইগুলোকে অঞ্জলি ভরে তুলে নিয়ে নদীর জলে ভাসিয়ে দিলাম। জল সেই ছাইকে নিজের ভেতর টেনে নিয়ে ধুয়েমুছে সাফ করে দিল। এক অদ্ভুত অনির্বচনীয় শান্তিতে আমার চোখ দুটো বুজে এলো। মনে হলো আমি পুনর্জন্ম লাভ করেছি। যে মানুষ ক্ষমা করতে পারে, সে স্বয়ং ঈশ্বরের চেয়েও এক ধাপ ওপরে উঠে যায়। কারণ ঈশ্বর তো কখনো কখনো পাপীদের শাস্তি দেন, কিন্তু ক্ষমাশীল প্রেমিক কোনো শাস্তি না দিয়ে কেবল নিজের বুক পেতে দেয়।

ক্ষমা করে দেওয়া মানে তো সব বিষাক্ত স্মৃতি ধুয়ে ফেলা,
চুকিয়ে দেওয়া জীবনের সমস্ত মিথ্যে প্রতিশোধের খেলা।
বুড়িগঙ্গার কালো জলে ভাসিয়ে দিলাম আমার সমস্ত ক্ষোভ,
মুছে গেল বুকের ভেতর থেকে ভালোবাসা পাওয়ার শেষ লোভ।

কত বছর ধরে বয়ে বেড়িয়েছিলাম এই বিষের জ্বলন্ত বোঝা,
আজ সব হালকা হয়ে গেল, মিলল মুক্তির সহজ সোজা।
কোনো শত্রু নেই এই জগতে, নেই কোনো অপরাধী আর,
ভেঙে চুরমার হয়ে গেল আমার আজন্মের কারাগার।

এক অলৌকিক নিস্তব্ধতা নেমে এলো আমার সমস্ত সত্তায়,
আমি অবগাহন করলাম এক চিরন্তন পরম ক্ষমতায়।
ক্ষমাশীল হৃদয়ই জানে প্রেমের আসল ঈশ্বর কে হতে পারে,
সে যে এক পলকেই আলো জ্বালায় সমস্ত অন্ধকার কারাকারে।

আমি ঘাট থেকে উঠে দাঁড়াই। শরীরটা যেন পালকের মতো হালকা। বাতাসে আর কোনো বিষাক্ত গন্ধ নেই, নদীর ভেজা বাতাসে এখন এক পবিত্র সুবাস পাচ্ছি। এই নিস্তব্ধতাই তো আমার পরম প্রাপ্তি।

আমি শান্ত চিত্তে শহরের রাজপথের দিকে পা বাড়াই। পেছনে পড়ে রইল আমার সমস্ত অতীতের হাহাকার, সমস্ত বিচ্ছেদের কান্না। তারা আর আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। কারণ যার মনে ক্ষমা এসে আসন পেতেছে, তাকে এই পৃথিবীর কোনো অস্ত্র দিয়েই আর নতুন করে ক্ষতবিক্ষত করা সম্ভব নয়। আমি সেই অপরাজেয় শান্তিতে পরিপূর্ণ।