অধ্যায় ০১শহরের সমস্ত ট্রাফিক থেমে যাওয়ার পর
কোলাহলের অবসানে তোমার স্মৃতির একচ্ছত্র আধিপত্য
রাত তখন পৌনে তিনটে। এই দানবীয় শহরের বুকের ওপর দিয়ে প্রতিদিন যে লক্ষ লক্ষ চাকা ধোঁয়া আর হর্ন ছড়িয়ে ছুটে চলে, তারা সবাই এখন যে যার গ্যারেজে অথবা নিথর ফুটপাথের কিনারায় ঘুমিয়ে পড়েছে। নিয়ন বাতিগুলোর আলো ভিজে পিচের ওপর ঠিকরে পড়ে রক্তাভ এক আভা তৈরি করেছে। বাতাসটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠেছে, যেমনটা হয় বৃষ্টি নামার ঠিক আগের মুহূর্তে কিংবা বহু বছর আগের কোনো কান্না যখন হঠাৎ গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠে।
আমি টেবিল ছেড়ে উঠে এসে দক্ষিণ দিকের খোলা জানলাটার সামনে দাঁড়াই। এই শহরে দিনের বেলা দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব আধুনিক, খুব হিসেবি এক কেরানি বা প্রযুক্তিবিদ বলে সান্ত্বনা দেওয়া সহজ। তখন চারপাশের মানুষ, কাজের তাগাদা আর ট্রাফিকের তীব্র চিৎকারে ভেতরের আসল হাহাকারটা সহজে চাপা পড়ে যায়। কিন্তু রাত যখন সব মুখোশ খুলে নেয়, যখন প্রতিটি বহুতলের বাতি একে একে নিভে গিয়ে আকাশটাকে এক অনন্ত কালো পাথরের মতো দেখায়, তখন টের পাওয়া যায়, দিনের বেলার সেই সমস্ত ব্যস্ততা ছিল কেবল নিজেকে ফাঁকি দেওয়ার এক করুণ প্রচেষ্টা।
আমি বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা করেছি তোমার নামটাকে আমার মস্তিষ্ক থেকে উপড়ে ফেলতে। ভেবেছিলাম স্মৃতি হলো বইয়ের তাকের পুরোনো কোনো কাগজের মতো, ঝেড়ে ফেললে বা ছিঁড়ে আগুনে ফেলে দিলেই তার মুক্তি মেলে। অথচ কী আশ্চর্য, স্মৃতি আসলে কোনো কাগজ নয়, স্মৃতি হলো রক্তের প্লাজমা। সে শিরায় শিরায় ঘোরে, হৃদযন্ত্রের প্রতিটি সংকোচনের সাথে সাথে ধাক্কা দেয়, আর মানুষ যখন নিঃশ্বাস নেয়, তখন সে ফুসফুসকে অবশ করে তোলে।
তুমি হয়তো এখন অনেক দূরে, নিজের সাজানো কোনো সংসারে শান্তিতে ঘুমোচ্ছ। তোমার ঘরের জানালায় হয়তো কোনো সুগন্ধি বাতাসের স্পর্শ, তোমার চাদরে হয়তো কোনো স্নিগ্ধ শান্তির গন্ধ। আমার এই রাত জাগা, এই অর্থহীনভাবে জানলার গ্রিল আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তোমাকে এক ফোঁটাও স্পর্শ করবে না। আর আমি চাইও না তা তোমাকে স্পর্শ করুক। ভালোবাসার ভেতর যদি কোনো করুণা পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে, তবে তা আর প্রেম থাকে না, তা হয়ে ওঠে ভিখারির দীনতা। আমি তো নিঃস্ব হতে জেনেছি, কিন্তু নিজেকে সস্তা করতে শিখিনি।
এই শহর যখন ঘুমিয়ে পড়ে সমস্ত কোলাহল ধুয়ে,
আমি একা জেগে থাকি তোমার ফেলে যাওয়া ছায়া ছুঁয়ে।
ট্রাফিকের শেষ সিগন্যালে লাল আলো জ্বলে থাকে একা,
যেমন আমার অবুঝ হৃদয়ে আঁকা তোমার প্রথম দেখা।কত শত রাত পেরিয়ে গেল নিস্তব্ধ ফুটপাথ ধরে,
প্রতিটি গলির মোড়ে শুধু তোমারই দীর্ঘশ্বাস ঝরে।
কোনো নালিশ নেই আমার এই নিঃশব্দ পোড়ার দিনে,
ভালোবেসে আমি নিঃস্ব হয়েছি নিজেই নিজেকে চিনে।ঈশ্বর হয়তো চেয়েছিল আমি বাঁচি কোনো নিয়মের খাঁচায়,
কিন্তু তোমার স্মৃতিই যে আজ এই মৃত প্রাণকে বাঁচায়।
আলো নিভে যাক সারা পৃথিবীর সমস্ত ঘরে ঘরে,
তুমি আছো এই বুকে, শতাব্দীর শেষ প্রহর জুড়ে।
আমি হাত বাড়িয়ে রাতের ঠান্ডা বাতাসটাকে ছুঁতে চাই। বাতাসের কোনো নিজস্ব রঙ নেই, কিন্তু এই রাতে তার ভেতর কেমন এক পরিচিত শিউলি ফুলের গন্ধ পাই, যে গন্ধটা একদিন তোমার সুতির শাড়ির আঁচলে মিশে ছিল। মানুষ মরে যায়, সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়, কিন্তু বাতাসের কণাগুলো হয়তো কোনোদিন সেই স্পর্শের স্মৃতি ভোলে না।
আজ ঈশ্বরের প্রতি আমার কোনো নালিশ নেই। একসময় মনে হতো তিনি বড় নিষ্ঠুর, তিনি কেন আমাদের মাঝখানে দুর্ভেদ্য এক মহাসমুদ্রের দূরত্ব তৈরি করে দিলেন। কিন্তু এই নিস্তব্ধ মধ্যরাতে যখন আমি আমার একাকীত্বকে ভালোবেসে ফেলতে শিখেছি, তখন বুঝি, তোমাকে না-পেয়েও তো আমি অনন্ত এক অমৃতের সন্ধান পেয়েছি। যে তোমাকে পেয়েছে সে কেবল তোমার শরীরটুকু চিনেছে, আর যে তোমাকে হারিয়েছে, সে তোমার মাধ্যমে গোটা মহাবিশ্বকে ক্ষমা করতে শিখেছে। রাত আরও গভীর হয়, আর আমি সেই ক্ষমার আলোয় নিঃশব্দে স্নাত হতে থাকি।