পর্ব ২: কুয়াশা, স্মৃতি ও অসমাপ্ত কথন

অধ্যায় ১৮বইমেলার ধুলো ও একটি চেনা চাদর

ভিড়ের মাঝে আচমকা চিনে ফেলার তীব্র অস্থিরতা

৫ মিনিট পাঠ

ফাল্গুনের সেই ধুলোমাখা বিকেলে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে পা ফেলার জায়গা ছিল না। বইয়ের মলাটের চকচকে রঙ, নতুন কাগজের তীব্র সুবাস আর হাজার হাজার মানুষের কলকাকলিতে চারপাশটা মুখরিত ছিল। মেহগনি গাছের পাতা ঝরে ঝরে পড়ছিল মানুষের মাথার ওপর, আর ধূলিকণাগুলো সূর্যের আলোয় কুয়াশার মতো জ্বলছিল।

আমি একটা লিটল ম্যাগাজিনের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে একটা কবিতার বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই, ভিড়ের স্রোতের ভেতর দিয়ে মাত্র দশ গজ দূর দিয়ে কেউ একজন হেঁটে গেল। পরনে একটা পরিচিত গাঢ় বাদামি রঙের কাশ্মীরি শাল, যার পাড়ে লাল সুতোর সূক্ষ্ম কাজ করা ছিল। সেই শালটা আমার হাজারটা মানুষের ভিড়েও অচেনা লাগার কথা নয়। কত শীতের সন্ধ্যায় ওই শালটার ওম আমার সমস্ত অস্তিত্বকে জড়িয়ে রেখেছিল।

আমার হাত থেকে বইটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। বুকের ভেতর এমন এক তীব্র ঝাঁকুনি লাগল যেন কেউ জীবন্ত হৃৎপিণ্ডের ওপর গরম সীসা ঢেলে দিয়েছে। আমি ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতে চাইলাম। কিন্তু বইমেলার সেই উন্মত্ত জনতার স্রোত আমাকে উল্টোদিকে ঠেলে দিতে লাগল। আমি দূর থেকে দেখতে পেলাম তোমার চুলের পরিচিত সেই খোঁপা, চশমার ফ্রেমের সেই চেনা আভা। তুমি পাশে হাঁটা কারো সাথে হেসে কথা বলছিলে।

সেই হাসিটা দেখার পর আমার পা দুটো মাটিতে যেন শেকড় গেড়ে বসে গেল। আমি আর এক পা-ও এগোতে পারলাম না। কার সাথে কথা বলছিলে তুমি? সেটা দেখার বা জানার কোনো অধিকার আমার নেই। তুমি এখন অন্য এক জগতের বাসিন্দা, অন্য এক পৃথিবীর আলো। আমি যদি গিয়ে তোমার সামনে দাঁড়াতাম, তবে কেবল এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। মানুষ যখন চলে যায়, তখন তার স্মৃতিটাকে ভালোবাসাই বুদ্ধিমানের কাজ, তার রক্তমাংসের বর্তমানকে বিরক্ত করা এক ধরনের অসভ্যতা।

বইমেলার ধুলো উড়ছিল ফাল্গুনের সেই রক্তিম সাঁঝে,
আচমকা চিনে ফেললাম তোমায় হাজার অচেনা মানুষের মাঝে।
সেই বাদামি শাল, সেই চেনা চুলের এলোমেলো খোঁপা,
যার জন্য একদিন লিখেছিলাম আমি কত কবিতার স্তূপা।

কত কাছে ছিলে তুমি, অথচ ছোঁয়া গেল না সেই হাত,
নিমেষে নেমে এলো আমার বুকের ভেতর অন্ধকার এক রাত।
তুমি হাসছিলে অন্য কারো কথার পিঠে কথা সাজিয়ে,
আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম নিজের ভেতরে রণদামামা বাজিয়ে।

ভিড়ের স্রোতে হারিয়ে গেলে তুমি আবার অচেনা এক বাঁকে,
এই শহরের ধুলোবালি চিরকাল মনে রাখবে আমাকে।
দেখা হয়েও দেখা হলো না, এই তো বিরহের চরম রূপ,
আমি ধুলোমাখা বই বুকে চেপে আবার হয়ে গেলাম নিশ্চুপ।

তুমি ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেলে। আমি আর কবিতার বইটা কিনিনি। মেলা থেকে বেরিয়ে এসে দোয়েল চত্বরের মোড়ে একলা একটা ফুটপাথে এসে দাঁড়ালাম। বাতাসের ভেতর তখনও বইমেলার ধুলো উড়ছিল, আর সেই ধুলো আমার চোখে গিয়ে বিঁধছিল। মানুষ স্মৃতিকে এড়িয়ে চলতে চায়, কিন্তু স্মৃতি ঠিক এমনই অতর্কিত জায়গায় এসে ছুরি মারে যেখানে মানুষ সবচেয়ে বেশি অসতর্ক থাকে।

দেখা হয়েছিল, এই তো অনেক। তুমি বেঁচে আছো, সুস্থ আছো, হাসতে পারছো, একজন প্রকৃত প্রেমিকের কাছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? আমি তোমার সেই হাসিমুখের দৃশ্যটাকেই মনে রাখব। তুমি আমাকে ভুলে গেছো বলেই তো তুমি হাসতে পারছো, আর আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি বলেই তো আমি বেঁচে আছি। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই হয়তো এই মহাবিশ্বের চরম ভারসাম্য লুকিয়ে আছে।