পর্ব ২: কুয়াশা, স্মৃতি ও অসমাপ্ত কথন

অধ্যায় ১৯রেডিওতে বেজে ওঠা সেই পুরোনো গান

স্মৃতিগুলো কখনো কখনো অতর্কিতে ছুরির মতো বিঁধে যায়

৫ মিনিট পাঠ

পুরোনো ফিলিপস রেডিওটা আমার টেবিলের এক কোণে পড়ে থাকত বোবা এক বাক্সের মতো। কখনো কখনো নিঃসঙ্গতা যখন অসহ্য হয়ে উঠত, তখন আমি তার নব ঘুরিয়ে শর্টওয়েভের অদ্ভুত হিসহিস শব্দ শুনতাম। সেই শব্দের ভেতর কেমন এক মহাজাগতিক একাকীত্বের সুর ছিল। সেদিন মধ্যরাতে নব ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ আকাশবাণীর কলকাতা ক খ কেন্দ্রের মৃদু এক তরঙ্গ আটকে গেল।

রেডিওর স্পিকারের ভাঙা পর্দাটা কেঁপে উঠল এক অতি পরিচিত গানে: এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়, এ কি বন্ধনে বাঁধিলে গো বন্ধু…। গানটা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই আমার ঘরের চার দেওয়াল যেন এক নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল। ঘরের ভেতরের সমস্ত বাতাস কেমন যেন ভারী হয়ে এলো, যেমনটা হয় যখন কোনো প্রাচীন মন্দিরের গর্ভগৃহে বহু বছর পর কোনো প্রদীপ জ্বালানো হয়।

এই গানটা ছিল তোমার সবচেয়ে প্রিয়। কোনো এক বৃষ্টির দিনে আমরা একটা ছোট্ট ক্যাফেতে বসেছিলাম, তখন বাইরে তুমুল ঝড় আর ভেতরে মৃদু স্বরে বাজছিল এই গানটি। তুমি টেবিলের ওপর হাত রেখে চোখ বন্ধ করে গানটা শুনছিলে, আর তোমার ঠোঁটের কোণে লেগেছিল এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। তুমি বলেছিলে, এই গানটা শুনলে মনে হয় পৃথিবীর সব দুঃখ মিথ্যে, শুধু ভালোবাসাটুকুই সত্যি।

আজ সেই গান আবার বাজছে। রেডিওর স্পিকার দিয়ে সেই একই সুর, সেই একই শিল্পীর কণ্ঠ ভেসে আসছে। কিন্তু সেই বিকেলটা কোথায়? সেই বৃষ্টির শব্দ কোথায়? আর সেই হাতটা কোথায় যা টেবিলের ওপর রাখা ছিল? গান থেকে যায়, সুর অবিনশ্বর হয়ে টিকে থাকে, কেবল রক্তমাংসের মানুষগুলো ধুলোর মতো বাতাসে মিলিয়ে যায়। সঙ্গীতের এই অমরত্বই মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাকে উপহাস করে।

পুরোনো রেডিওর তার বেয়ে নেমে এলো সেই গান,
যা শুনে একদিন কেঁপে উঠেছিল আমার সমগ্র প্রাণ।
সুবর্ণ সন্ধ্যায় বাঁধা সেই মায়াবী বন্ধন ছিঁড়ে গেছে কবে,
আজ কেবল স্মৃতির ছায়ারা নাচে এই নিস্তব্ধ মহোৎসবে।

কত সুর বেঁচে থাকে মানুষের ক্ষণস্থায়ী মৃত্যুর পরেও,
গান তো ভোলে না কাউকে, মানুষ যতই দূরে সরে যেও।
স্পিকারের ভাঙা পর্দায় কাঁপে এক চেনা কণ্ঠের মাদকতা,
আর আমার বুকের ভেতর জন্ম নেয় সহস্র না-বলা কথা।

নিভিয়ে দিলাম না রেডিও, বাজতে দিলাম শেষ সুর পর্যন্ত,
এই দহনই তো আমার পরম পাথেয়, এই দহনই অনন্ত।
গানের শেষে নেমে এলো আবার সেই অনন্ত নীরবতার রাত,
আমি অন্ধকারের বুকে চেপে ধরলাম আমার ক্ষতবিক্ষত হাত।

গানটা শেষ হলো। রেডিওর ঘোষক পরবর্তী অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিল খুব সাধারণ, যান্ত্রিক গলায়। তার কাছে এটা কেবল একটা তিন মিনিটের গান ছিল, কিন্তু আমার কাছে এটা ছিল একটা পুরো জীবনের ময়নাতদন্ত। আমি নব ঘুরিয়ে রেডিওটা বন্ধ করে দিলাম। এক নিমেষে আবার সেই জমাট অন্ধকার আর নৈশব্দ ঘরটাকে গ্রাস করে নিল।

শিল্প মানুষকে অমর করে, কিন্তু সেই অমরত্ব বড় নিষ্ঠুর। সে মানুষের ক্ষতের ওপর লবণ ছিটিয়ে দিয়ে তাকে শিল্প বানিয়ে বিক্রি করে। আমি কোনো শিল্পী হতে চাইনি, আমি চেয়েছিলাম একজন সাধারণ মানুষ হতে, যে ভালোবেসে ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে শান্তিতে মরতে পারে। কিন্তু ঈশ্বর আমাকে সেই শান্তি দেননি, তিনি আমাকে দিয়েছেন স্মৃতির এক অনন্ত ক্যাকটাসের বাগান। আমি সেই ক্যাকটাসের কাঁটা বুকে বিঁধিয়েই বেঁচে রইলাম।