পর্ব ১: রক্তমাংসের পরাজয় ও গোপন ক্ষত

অধ্যায় ০৪আঙুল ছুঁতে না পারার আবহমান শীত

দূরত্বই হয়তো ভালোবাসার সবচেয়ে নিখুঁত রূপ

৫ মিনিট পাঠ

পৌষের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যাটার কথা মনে পড়লে আজও আমার আঙুলের ডগাগুলো কেমন অবশ হয়ে আসে। শীতের বাতাসে তখন পোড়া কয়লা আর ধোঁয়ার তীব্র গন্ধ মিশে ছিল। আমরা দুজন হেঁটে যাচ্ছিলাম ধানমন্ডি লেকের পার দিয়ে। লেকের কালো জল তখন ঠান্ডায় বরফের মতো জমে গিয়েছিল, আর পারের মেহগনি গাছগুলো থেকে শুকনো পাতা ঝরে পড়ছিল টুপটাপ করে।

আমরা দুজন খুব কাছাকাছি হাঁটছিলাম, এতটাই কাছে যে তোমার উলের চাদরের একটা কোণ বারবার আমার কোটের হাতায় এসে ঘষা খাচ্ছিল। তোমার হাত দুটো ছিল খোলা, ঠান্ডায় তোমার ফর্সা আঙুলগুলো কেমন রক্তিম হয়ে উঠেছিল। আমার খুব ইচ্ছে করছিল তোমার ডান হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় তুলে নিই, আমার জ্যাকেটের পকেটের ভেতর লুকিয়ে রাখি, যেন এই নির্দয় পৃথিবীর সমস্ত শীত তোমাকে স্পর্শ না করতে পারে।

কিন্তু আমি তা পারিনি। আমার হাত দুটো পকেটের ভেতরে শক্ত মুঠি করে রাখা ছিল। আমি জানতাম, এই আঙুলগুলো যদি একবার একে অপরকে স্পর্শ করে ফেলে, তবে আমাদের এই নিভৃত স্বর্গটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। স্পর্শ মানুষকে লোভী করে তোলে, স্পর্শের পর দাবি জন্ম নেয়, আর দাবির পরই নেমে আসে বিচ্ছেদের কুৎসিত অন্ধকার। আমি চেয়েছিলাম আমাদের মাঝখানে এই যে সামান্য কয়েক ইঞ্চির ফাঁকা জায়গা, এই দূরত্বটুকুই হোক আমাদের চিরন্তন প্রার্থনার বেদি।

তুমি হয়তো লক্ষ্য করেছিলে আমার দ্বিধা। তুমি একবার আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসেছিলে, কিন্তু কোনো কথা বলোনি। আমরা কেবল নিঃশব্দে হেঁটে গিয়েছিলাম। পায়ের নিচে শুকনো পাতার মচমচ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না। সেই না-ছোঁয়া আঙুলগুলোর ভেতর দিয়ে কত লক্ষ কথার প্রবাহ যে বয়ে গিয়েছিল, তা কোনোদিন কোনো অভিধান লিখে প্রকাশ করতে পারবে না।

পাশাপাশি হেঁটে চলা তবু হাত দুটো ছোঁয়া হলো না,
এই শীতে জমে থাকা কথাগুলো মুখে আর বলা হলো না।
তোমার আঙুলের ডগায় ছিল কেমন এক বরফের মায়া,
তার পাশেই নীরবে হেঁটেছিল আমার অবাধ্য ছায়া।

কত কাছে ছিলাম আমরা, অথচ মাঝে ছিল শত যোজন নদী,
সেই দূরত্বটুকু মুছে যেত হাতটা বাড়িয়ে দিতাম যদি।
কিন্তু স্পর্শের লোভে আমি হারাতে চাইনি এই পবিত্রতা,
তাই না-বলা রইল আমাদের সমস্ত গোপন ব্যাকুলতা।

শীতের বাতাস এসে কাঁপিয়ে দিল মেহগনির শুকনো ডাল,
এই আবহমান ঠান্ডাই হয়তো আমার নিয়তির চিরকাল।
যে আঙুল ছোঁয়া যায়নি তাকে কোনোদিন ভোলা যাবে না,
এই তৃষ্ণার কোনো সমাপ্তি নেই, এর কোনো সীমা হবে না।

মানুষ ভাববে এটা কাপুরুষতা। তারা বলবে, ভালোবাসলে ছিনিয়ে নিতে হয়, অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কিন্তু আমি বলি, অধিকার তো দখলের নামান্তর, আর দখল করলেই বস্তুর পবিত্রতা হারিয়ে যায়। যা আমি কোনোদিন ছুঁইনি, তা কোনোদিন মলিন হতে পারে না। তোমার সেই ঠান্ডায় জমে যাওয়া রক্তিম আঙুলগুলো আজও আমার কল্পনায় ঠিক তেমনই অনবদ্য, তেমনই অপার্থিব সুন্দর হয়ে রয়ে গেছে।

আজ যখন ঘরে বসে এই লাইনগুলো লিখছি, বাইরে শীতের কনকনে হাওয়া বইছে। আমি আমার দুটো হাত বুকের ওপর জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করি। মনে হয়, সেই পৌষের রাতে তোমার না-ছোঁয়া আঙুলগুলোর উষ্ণতা আজও বাতাসে ভাসছে। ঈশ্বর হয়তো আমাদের মিলন দেননি ঠিকই, কিন্তু তিনি আমাদের এমন এক অতৃপ্তি উপহার দিয়েছেন, যা এক হাজার মিলনের চেয়েও বেশি জীবন্ত এবং চিরন্তন। আমি সেই অতৃপ্তির শীতেই নিজেকে সমর্পণ করি।