অধ্যায় ২৪যে স্মৃতি কোনোদিন পাথর হয় না
সময় যাকে স্পর্শ করতে পারে না
সাধারণত মানুষ বলে থাকে সময়ের সাথে সাথে সব স্মৃতি পাথর হয়ে যায়। নদী যেমন পলি জমিয়ে জমিয়ে একদিন শক্ত চরে পরিণত হয়, কিংবা পাহাড়ি ঝরনা শুকিয়ে গিয়ে পাথুরে খাদ তৈরি করে, মানুষের স্মৃতিও নাকি তেমনই এক সময় অনুভূতিহীন স্থবিরতায় রূপ নেয়। কিন্তু কিছু স্মৃতি আছে যারা কোনোদিন পাথর হতে শেখে না। তারা সবসময় তাজা মাংসের মতো নরম থাকে, সামান্য ছোঁয়া লাগলেই তাদের থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়।
তোমার সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে তেমনই এক রক্তক্ষয়ী স্মৃতি। দশ বছর আগের একটি তুচ্ছ কথার স্মৃতি আজও আমার কাছে ততটাই জীবন্ত, যতটা জীবন্ত আজকের সকালের সূর্যের আলো। তুমি যখন রাগ করে ডান ভ্রূটা কুঁচকে চাইতে, কিংবা রিকশায় ওঠার সময় শাড়ির কুঁচিটা এক হাতে সামলে নিয়ে মৃদু হেসে বলতে, সাবধানে উঠো, উল্টে পড়ে যেও না, সেই মুহূর্তগুলো কোনো পাথুরে ভাস্কর্য নয়। তারা জলজ্যান্ত মানুষের মতো আমার সাথে সাথে ঘরে হাঁটে, কথা বলে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
সময়ের একটা নিষ্ঠুর ধর্ম আছে, সে সবকিছুকে ক্ষয় করে দেয়। লোহার গায়ে মরচে ফেলে, কাঠের আসবাবে ঘুণ ধরায়, মানুষের চামড়ায় বলিরেখা এঁকে দেয়। কিন্তু আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, সময়ের সমস্ত রাসায়নিক প্রক্রিয়া তোমার স্মৃতির সামনে এসে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যায়। সেখানে কোনো ক্ষয়ের চিহ্ন নেই, সেখানে কোনো বয়সের দাগ নেই। তুমি আমার হৃদয়ে চিরকাল সেই তেইশ বছরের জলপাই রঙের কামিজ পরা তরুণী হয়েই রয়ে গেছো।
এই অপরিবর্তনীয়তাই হলো প্রেমের চূড়ান্ত অলৌকিকত্ব। যা সময়ের অধীন, তা পার্থিব; কিন্তু যা সময়ের বাইরে পা রেখে চিরন্তন হয়ে ওঠে, তা সরাসরি ঈশ্বরের সিংহাসনকে স্পর্শ করে। তাই আমার এই স্মৃতিকে আমি কোনোদিন পাথরে রূপান্তর হতে দেব না। পাথর নির্দয়, পাথর অনুভূতির অতীত। আমি চাই স্মৃতি নরম থাকুক, তাতে যদি আমৃত্যু রক্তক্ষরণও হয়, তবুও আমি সেই রক্তপাতের ভেতর দিয়ে আমার ভালোবাসাকে জীবন্ত রাখব।
সময়ের স্রোতে সব কিছু ভেসে যায় ধুলোর মতো উবে,
কত সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে কত অতল সাগরে ডুবে।
কিন্তু তোমার স্মৃতি কোনোদিন হলো না পাষাণ বা পাথর,
সে আজও তাজা ক্ষতের মতো করে আমায় আকুল কাতর।দশটি বছর পেরিয়ে গেল এই বিষাক্ত শহরের বাঁকে বাঁকে,
তবু কেউ ভুলিয়ে দিতে পারল না তোমার ওই মুখখানিকে।
নরম পাতার মতো কাঁপে আজও সেই ফেলে যাওয়া এক কথা,
যা আমার অস্তিত্বের গভীরে বুনে দিয়েছে অনন্ত ব্যাকুলতা।পাথর হতে চাইনি আমি, চেয়েছি প্রেমিকের রক্তে বাঁচিতে,
নিজের সমস্ত অহংকার সমর্পণ করতে তোমার পদধূলিতে।
যে স্মৃতি পাথর হয় না সে যে স্বয়ং এক দেবতার দান,
তার কাছে নতজানু হয়ে রইল আমার সমগ্র জীবন ও প্রাণ।
আমি জানলার গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাই। শহরের আকাশে তখন কোনো তারা নেই, শুধু ইটভাটার ধোঁয়া আর কুয়াশার এক ভারী আস্তরণ। কিন্তু আমার বুকের ভেতর জ্বলছে সেই স্মৃতি, যা কখনো নিভবে না। মানুষ যদি অমরত্ব খুঁজতে চায়, তবে তার কোনো অমৃত পান করার প্রয়োজন নেই। সে শুধু কাউকে এমনভাবে ভালোবাসুক যেন তার স্মৃতি সময়ের সমস্ত ক্ষয়ের নিয়মকে অস্বীকার করতে পারে।
আমি সেই অমরত্বের অধিকারী হয়েছি। তোমাকে হারিয়েও আমি এমন এক সম্পদ পেয়েছি যা কোনো রাজা-বাদশাহের ধনভাণ্ডারেও নেই। এই স্মৃতি আমার একমাত্র সঙ্গী, আমার একমাত্র ধর্ম। আমি তাকে পরম স্নেহে নিজের বুকের গভীরে আগলে রাখব, যতদিন না আমার শেষ নিঃশ্বাসটুকু বাতাসের সাথে মিশে যায়।