অধ্যায় ১২কেউ কথা রাখেনি, শহরও না
প্রতিশ্রুতিগুলো কেবল বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার জন্যই তৈরি হয়
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন তেত্রিশ বছর কেটে গেল কেউ কথা রাখেনি। কিন্তু আমি বলি, মানুষ তো রক্তমাংসের দুর্বল প্রাণী, সে কথা না রাখলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আসল বিশ্বাসঘাতকতা তো করে এই শহর। যে শহর একদিন দুজন মানুষকে এক ছাতার নিচে আশ্রয় দিয়েছিল, যে ফুটপাথ তাদের যৌথ পদচিহ্ন বহন করেছিল, সেই শহরটাই কয়েক বছর পর কেমন নিষ্ঠুর নির্লিপ্ততায় সব মুছে ফেলে নতুন পিচ ঢেলে দেয়।
আজ পলাশীর মোড়ের পুরোনো বুকস্টলটার সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো, এই শহর আসলে এক বিশাল কবরস্থান। এখানে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ প্রতিশ্রুতি মাটিচাপা পড়ে। কেউ বলেছিল, জীবনে যাই ঘটুক না কেন আমরা অন্তত বন্ধু থাকব। কেউ বলেছিল, প্রতি শুক্রবার বিকেলে আমরা একবার অন্তত কথা বলব। সেই সমস্ত কথা আজ এই শহরের বিষাক্ত ধোঁয়া আর ধূলিকণার ভেতর মিলিয়ে গেছে, যেমন করে শুকিয়ে যাওয়া নর্দমায় আবর্জনা ভেসে যায়।
প্রতিশ্রুতি হলো মানুষের তৈরি করা সবচেয়ে বিপজ্জনক ফাঁদ। দুর্বল মুহূর্তে মানুষ এমন সব শপথ করে ফেলে, যার ভার বহন করার ক্ষমতা তার নেই। আর যে বিশ্বাস করে, সে সেই কথাগুলোকে বুকের ভেতর পবিত্র ধর্মগ্রন্থের শ্লোকের মতো সাজিয়ে রাখে। কিন্তু সময় যখন তার ধারালো কাঁচি চালায়, তখন দেখা যায় শ্লোকগুলো সবই ছিল ফাঁপা শব্দের স্তূপ।
তুমি কথা রাখোনি, কিন্তু সেজন্য আমি তোমাকে কোনোদিন দোষারোপ করিনি। মানুষ তো পরিস্থিতি আর নিরাপত্তার কাছে নিজেকে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। তুমিও তাই করেছিলে। কিন্তু আমি কষ্ট পেয়েছিলাম এই ভেবে যে, তুমি অন্তত একবার সাহস করে বলতে পারলে না: আমি পারছি না, আমি হেরে গেছি। তুমি পালালে এক চতুর কূটনীতিবিদের মতো, সমস্ত দোষ ভাগ্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার ভান করে।
তেত্রিশ বছর নয়, মাত্র কয়েকটা ঋতুই ছিল যথেষ্ট,
চিনে নিতে মানুষের মুখ আর সম্পর্কের আসল কষ্ট।
কেউ কথা রাখেনি এই নির্দয় পাথুরে মহানগরে,
সব প্রতিশ্রুতি ধুয়ে গেছে বিষাক্ত বৃষ্টির তোড়ে।তুমি বলেছিলে রোদ উঠলেই কেটে যাবে এই ঘন কালো মেঘ,
অথচ বাড়িয়ে দিলে আমার অনন্ত রক্তক্ষরণের বেগ।
শহরও ভুলে গেল আমাদের সেই একসাথে হেঁটে চলা পথ,
নতুন উল্লাসে ছুটে চলল ক্ষমতাবানদের জয়রথ।কোনো নালিশ নেই আমার এই ভাঙা কাচের শহরে বসে,
আমি প্রতিদিন মুক্তি খুঁজি নিজের রক্তক্ষরণের রসে।
কথা যারা রাখে না তারা হয়তো খুব শান্তিতে বাঁচে,
আর যারা কথা রাখে তারা আজীবন কয়লার মতো আঁচে।
আমি বুকস্টলের সামনে থেকে একটা পুরোনো কবিতার বই হাতে নিই। পাতাগুলো উল্টাতে গিয়ে একটা শুকনো ঘাসের টুকরো দেখতে পাই। হয়তো বহু বছর আগে কোনো পাঠক ভালোবেসে এই ঘাসটা বইয়ের পাতার ভেতর রেখে দিয়েছিল। সেই পাঠক কোথায়? সেই ভালোবাসা কোথায়? কেউ জানে না।
জীবন আসলে এমনই এক অসম্পূর্ণ বই, যার বেশিরভাগ পৃষ্ঠাই ছেঁড়া থাকে। আমরা কেবল সেই শূন্যস্থানগুলো পূরণ করার চেষ্টা করি কল্পনা আর দীর্ঘশ্বাস দিয়ে। শহর তার নিয়মে চলতে থাকে, ট্রাফিক বাড়ে, ফ্লাইওভার তৈরি হয়, পুরোনোগুলো ভেঙে নতুন চকচকে শপিং মল ওঠে। কিন্তু এই প্রগতির ভিড়ে কেউ সেই কথাগুলোর হিসেব রাখে না, যা কোনো এক শীতের রাতে হারিয়ে গিয়েছিল। আমি বইটা রেখে দিয়ে আবার ফুটপাথে নেমে আসি।