পর্ব ৩: দর্শনের পরাজয় ও প্রেমের উন্মেষ

অধ্যায় ২৯একাকীত্বের কোনো মহত্ত্ব নেই

নিঃসঙ্গতা কেবল বেঁচে থাকার একটি বাধ্যতামূলক অভ্যাস

৫ মিনিট পাঠ

রোমান্টিক কবি আর সাহিত্যিকেরা একাকীত্বকে এক বিশাল মহিমায় ভূষিত করে গেছেন। তারা নিঃসঙ্গতাকে সাধকদের ধ্যান, সৃজনশীলতার উর্বর ক্ষেত্র আর আত্মার পবিত্র স্নান বলে বর্ণনা করেছেন। আমি বহু বছর ধরে সেই রোমান্টিক ধারণার আফিম খেয়ে বেঁচে ছিলাম। একা একা কফি হাউজের কোণে বসে সিগারেট ফুঁকতাম আর ভাবতাম আমি এক অনন্য মহিমান্বিত নিঃসঙ্গ পুরুষ, যাকে সাধারণ মানুষের ভিড়ে চেনা যায় না।

আজ মধ্যবয়সে এসে এই মিথ্যার মুখোশটা ছিঁড়ে ফেলতে আমার কোনো লজ্জা নেই। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, একাকীত্বের ভেতরে কোনো বালখিল্য মহত্ত্ব নেই। নিঃসঙ্গতা বড় নোংরা, বড় করুণ আর বড় বীভৎস এক অবস্থা। সে মানুষকে ধীরে ধীরে কুরে কুরে খায়, সে মানুষের আত্মবিশ্বাসকে নষ্ট করে দেয় এবং তাকে নিজের সাথে কথা বলার মতো এক উন্মাদে পরিণত করে।

মানুষ একা বাঁচার জন্য জন্মায়নি। মানুষ জন্মায় অন্য একটি মানুষের হাত ধরে পথ চলার জন্য, নিজের ভয়গুলো ভাগ করে নেওয়ার জন্য, আর রাতে ঘুমানোর সময় কারো উষ্ণ নিঃশ্বাস নিজের ঘাড়ে অনুভব করার জন্য। আপনি যত বড় দার্শনিক হোন না কেন, অসুখের রাতে যখন তীব্র জ্বরে গা পুড়ে যায়, তখন মাথায় এক টুকরো জলপট্টি দেওয়ার মতো যদি কেউ না থাকে, তবে আপনার সমস্ত দর্শন ড্রেনের নোংরা জলের মতো অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।

আমি যে আজ একা, তা কোনো আমার স্বেচ্ছানির্বাচিত সাধনা নয়। এটি হলো এক বাধ্যতামূলক পরাজয়। আমি তোমাকে চেয়েছিলাম, আমি তোমার সাথে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলাম, আমি চেয়েছিলাম সাধারণ মানুষের মতো বাজার করে বাড়ি ফিরে তোমার সাথে সংসারের খুঁটিনাটি নিয়ে ঝগড়া করতে। কিন্তু জীবন আমাকে সেই সাধারণ সুখটুকু দেয়নি। আর দেয়নি বলেই আমাকে এই একাকীত্বের পোশাক পরে বেঁচে থাকার ভান করতে হচ্ছে।

কবিরা যাকেই বলুক না কেন একাকীত্বের পরম মহত্ত্ব,
আমি জানি এ কেবল এক করুণ পরাজয়ের আদিম তত্ত্ব।
একা থাকা কোনো সাধনা নয়, এ যে এক বন্দিশালার সাজা,
যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসে মানুষ বহন করে শূন্যতার বোঝা।

কত মিথ্যে বলেছি নিজেকে আমি মহিমান্বিত একাকীত্বের নামে,
আজ সব ভণ্ডামি খসে পড়ল জীবনের অন্তিম সন্ধার ধামে।
চেয়েছিলাম তোমার হাত ধরে বাঁচতে সাধারণ কোনো সুখে,
অথচ নিয়তি গুঁজে দিল অনন্ত হাহাকার আমার এই বুকে।

নিঃসঙ্গতা কোনো অলংকার নয়, এ এক বিষাক্ত ক্ষতের নাম,
যার জন্য প্রতিদিন চুকিয়ে দিতে হয় রক্তাক্ত এক চরম দাম।
তবু বাঁচতে হয় এই অভ্যাসকে সঙ্গী করে প্রতিদিনের বেশে,
আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম আমার এই ধ্বংসের শেষ দেশে।

আমি এই সত্যকে স্বীকার করে নিয়েছি। সত্যকে স্বীকার করলেই কেবল মানুষ শান্ত হতে পারে। আমি আর নিজের একাকীত্ব নিয়ে কোনো বড়াই করব না। আমি বলব, আমি একজন ব্যর্থ মানুষ, যে জীবনে ভালোবেসেছিল কিন্তু সেই ভালোবাসাকে ধরে রাখতে পারেনি। আর এই ব্যর্থতার কারণেই সে আজ একা।

কিন্তু এই নিঃসঙ্গতার ভেতরেও তোমার স্মৃতিই তো আমার একমাত্র আশ্রয়। যদি আমার জীবনটা একাকীত্বের অভিশাপে দগ্ধ হয়ে থাকে, তবে সেই অভিশাপের ভেতরে তোমার নামটি হলো একমাত্র আশীর্বাদ। আমি সেই নামটিকে সম্বল করেই বেঁচে থাকব। পর্ব তিনের সমাপ্তি এখানেই। এবার আমি সমস্ত অহংকার ধূলিসাৎ করে পর্ব চারে প্রবেশ করব, যেখানে ক্ষমা ছাড়া আর কোনো ভাষা অবশিষ্ট থাকে না।