পর্ব ৩: দর্শনের পরাজয় ও প্রেমের উন্মেষ

অধ্যায় ২৬তোমার হাসির কাছে পরাভূত সহস্র ব্যাকরণ

যুক্তির সমস্ত অহংকার যেখানে খসে পড়ে

৫ মিনিট পাঠ

ব্যাকরণ হলো নিয়মের শাসন। সে মানুষকে শেখায় কোথায় কমা দিতে হবে, কোথায় দাঁড়ি দিতে হবে, কোন শব্দের পর কোন বিভক্তি যুক্ত হবে। সমাজও এক সুবিশাল ব্যাকরণের বই। সে মানুষকে বলে দেয় কার সাথে কার সম্পর্ক মানায়, কোন বয়সে বিয়ে করতে হয়, কত টাকা উপার্জন করলে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়। এই সমস্ত ব্যাকরণ দিয়ে মানুষ জীবনটাকে এক অতি নিখুঁত ও সাজানো খাঁচা বানিয়ে ফেলে।

আমিও সেই ব্যাকরণের একজন বাধ্য ছাত্র ছিলাম। প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে দশবার হিসেব করতাম। লাভ-ক্ষতির খতিয়ান মিলিয়ে দেখতাম। কিন্তু তুমি যখন একদিন সেই পুরোনো কাঠের সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই খিলখিল করে হেসে উঠলে, তখন সেই হাসির তোড়ে আমার জীবনের সমস্ত ব্যাকরণের পাতাগুলো খড়কুটোর মতো উড়ে গেল।

তোমার সেই হাসির ভেতর কোনো শর্ত ছিল না, কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। সে ছিল পাহাড়ি ঝরনার মতো বাঁধভাঙা, অকৃত্রিম আর উদ্দাম। তোমার মুখের দুই কোণে দুটো ছোট্ট টোল পড়েছিল, আর চোখ দুটো চিকচিক করে উঠেছিল সূর্যের আলোর মতো। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, মানুষ যদি ব্যাকরণ আর নিয়মের পেছনে ছুটে জীবন কাটিয়ে দেয়, তবে সে এই পৃথিবীর সবচেয়ে করুণ মূর্খ।

যুক্তি দিয়ে কি কখনো কোনো প্রেমিকের মন বোঝা গেছে? বিজ্ঞান কি পরিমাপ করতে পেরেছে একটা হাসির জন্য একজন মানুষের নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়ার পেছনের কারণ? কোনোদিন পারেনি, পারবেও না। কারণ যেখানে যুক্তি শেষ হয়, ঠিক সেখান থেকেই প্রেমের রহস্যময় রাজ্যের সীমানা শুরু হয়। তোমার একটি হাসির কাছে আমার জীবনের সমস্ত সঞ্চিত জ্ঞান, সমস্ত সামাজিক মর্যাদা আর সমস্ত অহংকার এক নিমিষে পরাজিত হয়েছিল।

ব্যাকরণের নিয়মে বাঁধা ছিল আমার সমগ্র জীবন ও মন,
প্রতিটি পদক্ষেপে হিসেব মেলাতাম আমি রাত্রি ও দিনক্ষণ।
কিন্তু তোমার একটি হাসির তোড়ে ভেসে গেল সব যুক্তির বাঁধ,
নিমেষে ঘুচে গেল আমার বহুদিনের আজন্মের অন্ধ সাধ।

কী হবে অত নিয়ম মেনে যদি খাঁচাতেই বন্দি থাকে গান?।
তোমার ওই অমলিন হাসির কাছে তুচ্ছ আমার সমগ্র আত্মসম্মান।
টোল পড়া গালের ওই আলোয় চূর্ণ হলো পৃথিবীর সমস্ত ব্যাকরণ,
আমি সানন্দে বরণ করে নিলাম আমার এই মধুর পরাজয়ের মরণ।

পণ্ডিতেরা আসুক তাদের কঠিন শ্লোক আর বইয়ের সারি নিয়ে,
আমি তাদের উত্তর দেব কেবল তোমার ওই একটি হাসি দিয়ে।
যুক্তির চেয়ে অনেক বড় এই অবুঝ হৃদয়ের সহজ সমর্পণ,
যেখানে ভালোবেসেই মানুষ খুঁজে পায় তার জীবনের আসল দর্পণ।

আমি সেই পরাজয়কে উদযাপন করি। যে মানুষ কোনোদিন নিজের যুক্তির অহংকার ভেঙে নত হতে পারেনি, সে আসলে প্রেমের স্বাদই পায়নি। প্রেম মানুষকে যুক্তিহীন হতে শেখায়, সে মানুষকে শেখায় কীভাবে কোনো হিসেব ছাড়াই নিজেকে উজাড় করে দিতে হয়। তোমার সেই হাসিটাই ছিল আমার জীবনের সেরা শিক্ষা।

আজ তুমি দূরে, হয়তো আর কোনোদিন সেই হাসি আমার চোখের সামনে ফুটে উঠবে না। কিন্তু আমার স্মৃতির ক্যানভাসে সেই হাসি অমর হয়ে আঁকা আছে। যখনই চারপাশের দুনিয়ার নিয়ম-কানুনের চাপে আমি দমবন্ধ বোধ করি, আমি চোখ বন্ধ করে তোমার সেই টোল পড়া হাসির দৃশ্যটা মনে করি। আর সাথে সাথেই সমস্ত বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়, আমি আবার মুক্তির স্বাদ পাই।