পর্ব ২: কুয়াশা, স্মৃতি ও অসমাপ্ত কথন

অধ্যায় ২০তেত্রিশটি অসমাপ্ত স্বীকারোক্তি

যা কোনোদিন কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না

৫ মিনিট পাঠ

মানুষ তার জীবদ্দশায় যত কথা বলে, তার শতকরা নব্বই ভাগই অর্থহীন প্রলাপ। সে আবহাওয়ার কথা বলে, রাজনীতির কথা বলে, বাজারের দরদামের কথা বলে কেবল নিজের ভেতরের আসল কথাগুলোকে লুকিয়ে রাখার জন্য। ভাষা আবিষ্কার হয়েছিল সত্য প্রকাশের জন্য নয়, ভাষা তৈরি হয়েছিল মনের সত্যকে গোপন করে সমাজের সাথে আপস করার জন্য।

আমার বুকের ভেতর তেত্রিশটি এমন কথা জমে আছে, যা আমি কোনোদিন কাউকে বলিনি। এমনকী তোমাকেও না। সেই কথাগুলো যদি কোনোদিন প্রকাশ্যে আসত, তবে হয়তো কোনো একটা ঝড় উঠত, কোনো একটা সংসার ভেঙে যেত, কিংবা কোনো একটা সাজানো বাগান পুড়ে ছাই হয়ে যেত। তাই আমি সেই কথাগুলোকে একটা লোহার সিন্দুকের মতো নিজের বুকের ভেতর তালাবন্ধ করে রেখেছি। সেই সিন্দুকের চাবি আমি নিজেই বহু বছর আগে গভীর সমুদ্রে ফেলে দিয়েছি।

সেই স্বীকারোক্তিগুলোর প্রথমটি ছিল: আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে কোনোদিন স্পর্শ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা বোধ করিনি। দ্বিতীয়টি ছিল: আমি ঈশ্বরের কাছে কোনোদিন নিজের মুক্তির জন্য প্রার্থনা করিনি, আমি শুধু চেয়েছিলাম যেন তোমার কোনোদিন কোনো অমঙ্গল না হয়। আর তেত্রিশতম স্বীকারোক্তিটি ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর: আমি যদি জানতাম তোমাকে ভালোবাসলে আমার এই এক জীবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে, তবুও আমি এই ধ্বংসের পথটাই বেছে নিতাম।

এই কথাগুলো কোনোদিন কোনো চিঠিতে লেখা হবে না, কোনো আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে উঠবে না। তারা আমার সাথেই এই মাটির নিচে প্রবেশ করবে। কবরের নিস্তব্ধতায় যখন আমার শরীরটা ধুলোয় মিশে যাবে, তখন হয়তো সেই মাটির প্রতিটি কণা জেনে যাবে এই তেত্রিশটি গোপন হাহাকারের গল্প। পর্ব দুই এখানেই শেষ হলো। স্মৃতির কুয়াশা আর অসমাপ্ত কথার এই অধ্যায় পেরিয়ে এবার আমি প্রবেশ করব সেই জায়গায়, যেখানে মানুষ নিজের সমস্ত দর্শনের অহংকার বিসর্জন দিয়ে নতজানু হয়।

তেত্রিশটি কথা জমে ছিল এই বোবা হৃদয়ের গায়,
যা কোনোদিন প্রকাশ পায়নি কোনো ভাষার আশ্রয়ে বা ছায়ায়।
প্রতিটি কথার নিচে লুকিয়ে ছিল একেকটি জ্বলন্ত অঙ্গার,
যা পুড়িয়ে ছারখার করেছে আমার সাজানো অহংকার।

কোনো আদালত নেই যেখানে এই সত্য বলা যেতে পারে,
কোনো ঈশ্বর নেই যে শুনবে এই আর্তনাদ নিভৃত আঁধারে।
আমি সিন্দুক বন্ধ করেছি, ফেলে দিয়েছি তার অলৌকিক চাবি,
এই পৃথিবীর কাছে আমার নেই আর কোনো নালিশ বা দাবি।

পর্ব দুই শেষ হলো কুয়াশা আর হাহাকারের এই তীরে,
এবার যাত্রা শুরু হবে এক নতুন অনন্ত আলোর নীড়ে।
যেখানে দর্শনের সমস্ত বই খসে পড়ে এক পলকের টানে,
শুধু তুমি জেগে থাকবে আমার প্রতিটি রক্তের গানে।

আমি খাতা বন্ধ করি। বাইরে রাত শেষ হয়ে আসছে। ভোরের প্রথম ধূসর আলো জানলার শিকে এসে লেগেছে। এই শহরটা আবার জেগে উঠবে, মানুষ আবার মুখোশ পরে রাস্তায় নামবে, আবার মিথ্যের ব্যবসা শুরু হবে। কিন্তু আমি জানি, আমার এই নিঃস্বতার ভেতরে কোনো মিথ্যে নেই।

অসমাপ্ত কথাই তো জীবনের শ্রেষ্ঠ শিল্প। যা সমাপ্ত হয়ে যায়, তা তো ফুরিয়ে যায়। কিন্তু যা অসমাপ্ত থেকে যায়, তা মহাকালের ক্যানভাসে চিরন্তন এক ব্যাকুলতা হয়ে বেঁচে থাকে। আমার এই না-বলা কথাগুলোই আমার অমরত্ব। আমি সেই অমরত্বকে সঙ্গী করে আগামী দিনের পথে পা বাড়াই।