পর্ব ৪: ক্ষমা ও অনন্ত সমর্পণ

অধ্যায় ৩৩এক জীবনের সমস্ত ঋণ শোধ হয়ে গেল

পাওয়ার কোনো আশা না রেখে নিঃস্বার্থ হয়ে ওঠার মুক্তি

৫ মিনিট পাঠ

মানুষ এই পৃথিবীতে আসে এক বিশাল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে। পিতামাতার ঋণ, সমাজের ঋণ, প্রকৃতির ঋণ আর সবচেয়ে বড় কথা ঈশ্বরের দেওয়া জীবনের ঋণ। সারা জীবন মানুষ সেই ঋণ শোধ করার জন্য উদভ্রান্তের মতো ছুটে বেড়ায়। সে টাকা কামায়, প্রতিপত্তি অর্জন করে, সন্তান লালন-পালন করে ঋণমুক্ত হওয়ার আশায়। কিন্তু দিনশেষে দেখা যায় ঋণের পরিমাণ একটুও কমেনি, বরং আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।

কিন্তু ভালোবাসার এক অদ্ভুত জাদুকরি ক্ষমতা আছে। যে মানুষ নিজের সর্বস্ব উজাড় করে কোনো প্রত্যাশা ছাড়া কাউকে ভালোবাসতে পেরেছে, তার সমস্ত ঋণ এক নিমেষে শোধ হয়ে যায়। আমি যখন আমার জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন দেখি আমার কোনো দেনা নেই আর। আমি আমার রক্ত, আমার মস্তিষ্ক, আমার সময় আর আমার সমস্ত আবেগ তোমার চরণে অঞ্জলি দিয়ে দিয়েছি।

পাওয়ার কোনো আশা না রাখার ভেতরে যে কী অপরিসীম মুক্তি লুকিয়ে আছে, তা ভোগবাদী সমাজ কোনোদিন কল্পনাও করতে পারবে না। তারা মনে করে কিছু না পেলে মানুষ নিঃস্ব হয়ে যায়। কিন্তু সত্য হলো, কিছু না চাওয়ার মুহূর্তেই মানুষ মহাবিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষে পরিণত হয়। কারণ তখন তার কাছ থেকে আর কিছু কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা কারো থাকে না। মৃত্যুও তাকে আর ভয় দেখাতে পারে না, কারণ সে তো আগেই নিজেকে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিয়েছে।

আমি শূন্য হয়ে গেছি, আর এই শূন্যতাই আমার পূর্ণতা। আমি তোমাকে চেয়েছিলাম একসময়, তখন আমি ছিলাম এক কাঙাল ভিখারি। আজ আমি তোমাকে আর চাই না, আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসি। চাওয়ার অবসানেই ভালোবাসার প্রকৃত রূপ প্রকাশিত হয়। আমার এই এক জীবনের যা কিছু দেওয়ার ছিল, তা আমি দিয়ে ফেলেছি। আর কোনো বাকি নেই, কোনো হিসাবের খাতা খোলা নেই।

সমস্ত ঋণ শোধ হয়ে গেল এই জীবনের শেষ মোহনায় এসে,
আমি চিরদিনের মতো হারিয়ে গেলাম তোমার অনন্ত দেশে।
কোনো দেনা নেই আর আমার এই পৃথিবীর নিষ্ঠুর মানুষের কাছে,
যে মানুষ নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে সে তো পরমানন্দে বাঁচে।

চাওয়ার কোনো আশা ছিল না, ছিল না কোনো শর্তের জাল,
আমি উজার করে দিয়েছি আমার জীবনের সমস্ত মহাকাল।
ভিখারি থেকে আজ আমি হয়ে গেছি এক চিরন্তন সম্রাট,
যেখানে ভালোবেসেই চূর্ণ করেছি সমস্ত অহংকারের নাট।

মুক্তি এলো নিঃশব্দে যেন এক বসন্তের মৃদু দখিন হাওয়া,
যার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল পৃথিবীর সমস্ত কিছু পাওয়া।
এক জীবনে এই তো আমার পরম সাধনার শ্রেষ্ঠ ধন,
তোমার চরণে সমর্পণ করে দিয়েছি আমার সমগ্র মন।

আমি খাতা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াই। শরীরটা কেমন হালকা লাগছে, ঠিক যেমন লাগে যখন কোনো দীর্ঘ পাহাড়ি পথ হাঁটার পর মানুষ নিজের কাঁধের ভারী ব্যাকপ্যাকটা মাটিতে নামিয়ে রাখে। বাতাসের প্রতিটি কণা যেন আমার সাথে কথা বলছে।

আমি মুক্ত। এই মুক্তির কোনো তুলনা নেই। সমাজ আমাকে ব্যর্থ বলতে পারে, ইতিহাস আমাকে মনে নাও রাখতে পারে, কিন্তু এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধূলিকণারা সাক্ষী থাকবে যে এখানে একজন মানুষ হেঁটে গিয়েছিল, যে ভালোবাসার বিনিময়ে কোনোদিন এক ফোঁটা ভালোবাসাও ফেরত চায়নি। এই নিঃস্বার্থতাই তো মানুষের শ্রেষ্ঠ পরিচয়। আমি সেই পরিচয়েই শান্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াই।