অধ্যায় ০৩প্রথম দেখার সেই তির্যক রোদ
যে আলোয় আমার বহুদিনের অন্ধকার পরাজিত হয়েছিল
দিনটার কথা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। কার্তিক মাসের শেষ দিক, বাতাসে তখন হালকা শীতের গন্ধ আর গাছের পাতায় পাতায় হলুদ রঙের বিদায়ী আলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো লাইব্রেরির লম্বা বারান্দাটায় তখন কেউ ছিল না বললেই চলে। লাল ইটের দেয়ালে বিকেলের তির্যক রোদ এসে পড়েছিল ঠিক যেন কোনো প্রাচীন শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা এক টুকরো বিষণ্ণতা।
আমি একটা ভারী সমাজবিজ্ঞানের বই হাতে নিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছিলাম। তখন আমার বয়স এমন এক জায়গায় এসে ঠেকেছিল, যখন মানুষ নিজেকে খুব গভীর, খুব নির্লিপ্ত আর উদাসীন ভাবতে পছন্দ করে। ভাবতাম ভালোবাসাবাসি কেবল দুর্বল মনের মানুষের দুর্বলতা। আমি চেয়েছিলাম একজন কড়া যুক্তিবাদী হতে, যার চোখে আবেগের কোনো মূল্য থাকবে না। কিন্তু মানুষের সমস্ত আত্মবিশ্বাস যে কত ঠুনকো কাগজের তৈরি, তা ঈশ্বর ঠিক তখনই প্রমাণ করে দেন যখন মানুষ সবচেয়ে বেশি অহংকারী হয়ে ওঠে।
তুমি সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলে। তোমার পরনে ছিল হালকা জলপাই রঙের একটা সুতির কামিজ, আর কাঁধে ঝুলছিল শান্তিনিকেতনি কাপড়ের ঝোলা ব্যাগ। তোমার চশমার ফ্রেমের ওপরে এসে পড়েছিল সেই তির্যক সূর্যের আলো, যার কারণে তোমার চোখ দুটোকে ঠিক দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু যেই মুহূর্তে তুমি বারান্দার ছায়ায় পা রাখলে আর তোমার চোখ আমার চোখের ওপর এসে স্থির হলো, ঠিক সেই মুহূর্তে আমার পায়ের নিচে মেঝেটা যেন কয়েক ইঞ্চি দেবে গেল।
কোনো বজ্রপাত হয়নি, কোনো রোমাঞ্চকর সিনেমাটিক আবহসংগীত বাজেনি। চারপাশের ধুলোবালি যেমন উড়ছিল তেমনই উড়ল, দূরে পিচঢালা রাস্তায় একটা রিকশার ঘণ্টির টুংটাং শব্দ শোনা গেল। কিন্তু আমার বুকের ভেতর বহু শতাব্দি ধরে গড়ে তোলা যে পাথরের দুর্গটা দাঁড়িয়েছিল, তার একটা দেয়াল নিঃশব্দে খসে পড়ল। আমি শুধু হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মানুষ যে মাত্র এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে নিজের সমস্ত অতীতের শিকল ছিঁড়ে ফেলতে পারে, তা সেই আলো না দেখলে আমি কোনোদিন জানতাম না।
লাল ইটের দেয়ালে তখন বিকেলের অলস রোদ,
নিমেষে চূর্ণ হলো আমার আজন্মের অহংকারী শোধ।
চশমার কাচ পেরিয়ে যে আলো আমার চোখে নামল এসে,
আমি চিরতরে ভেসে গেলাম সেই রূপালী অকূল দেশে।কত তত্ত্ব পড়েছিলাম, কত দর্শনের জমাট জটিলতা,
এক পলকে মুছে গেল সেই সমস্ত অপ্রয়োজনীয় কথা।
শুধু জেগে রইল একজোড়া শান্ত চোখের অদ্ভুত ভাষা,
যা এক নিমেষে ভাসিয়ে দিল আমার চিরদিনের নৈরাশ্য ও আশা।তুমি জানলে না কোন জাদুতে বদলে গেল পৃথিবীর রূপ,
চারপাশের সমস্ত শহর হয়ে গেল অপার্থিব নিশ্চুপ।
সেই প্রথম দেখার দাগ মুছে ফেলা যাবে না কোনো জলে,
সে যে রক্ত হয়ে আজও আমার প্রতিটি শিরায় জ্বলে।
তুমি পাশ কাটিয়ে লাইব্রেরির অন্ধকার করিডোরে ঢুকে গেলে। তোমার চটি জুতোর খটখট শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল পুরোনো বইয়ের ধুলোমাখা গন্ধের ভেতর। আমি আর নড়তে পারিনি। কতক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়েছিলাম জানি না, কিন্তু যখন ঘোর কাটল তখন দেখলাম সূর্যটা ডুবে গেছে আর চারপাশের আকাশে ঘন নীল অন্ধকার নামছে।
সেই যে আলো আমি দেখেছিলাম, সেই আলো আর কোনোদিন আমার চোখ থেকে সরেনি। বহু বছর ধরে বহু ঝড়ে আমি পুড়েছি, বহু মানুষের প্রতারণায় বিশ্বাস হারিয়েছি, কিন্তু সেই কার্তিকের বিকেলের এক টুকরো আলো আজও আমার বুকের এক কোণে ঠিক আগের মতোই অমলিন হয়ে জ্বলছে। সেই আলোর দিকে চেয়েই তো আমি বেঁচে রইলাম। ঈশ্বর যদি আমাকে অন্ধ করে দিতেন, তবুও হয়তো আমি সেই আলোর ঘ্রাণ পেতাম। কারণ প্রথম দেখার আলো কেবল চোখের দেখার বিষয় নয়, তা আত্মার ভেতরে চিরস্থায়ীভাবে খোদাই হয়ে যাওয়া এক মহাজাগতিক স্বাক্ষর।