অধ্যায় ১৪পুরোনো ডায়েরির হলদেটে পাতা
যেখানে প্রতিটি শব্দের নিচে তোমার নিঃশ্বাস জমে আছে
বইয়ের আলমারির সবচেয়ে নিচের তাকটায়, বাতিল হওয়া কিছু কাগজপত্র আর পুরোনো ট্যাক্স ফাইলের নিচে চাপা পড়েছিল নীল রঙের রেক্সিনের মলাট দেওয়া ডায়েরিটা। মলাটের কোণগুলো ইঁদুরে একটু কেটে দিয়েছে, আর পাতাগুলো সময়ের প্রভাবে কেমন হলদেটে আর ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে। হাত দিলেই কেমন একটা পুরোনো স্যাঁতসেঁতে আলমারির ন্যাপথলিন আর ধুলোর গন্ধ নাকে আসে।
আমি ডায়েরিটা কোলে নিয়ে বসি। টেবিলে জ্বলছে টেবিল ল্যাম্পের মৃদু সাদা আলো। পাতাগুলো ওল্টাতে গিয়ে আমার আঙুলগুলো কেমন যেন থরথর করে কাঁপতে থাকে। মনে হয় আমি কোনো কাগজ ছুঁচ্ছি না, আমি স্পর্শ করছি বহু বছর আগের এক তাজা হৃৎপিণ্ড, যা আজও স্পন্দিত হচ্ছে। প্রতিটা পাতায় সেই সময়কার তারিখ লেখা, আর সেই তারিখগুলোর নিচে কাঁচা হস্তাক্ষরে লেখা কত শত পাগলামি, কত শত অর্থহীন অভিমান আর অনন্ত ভালোবাসার কথা।
একটা পৃষ্ঠায় গিয়ে চোখ আটকে গেল। লেখা আছে: আজ ও প্রথম আমার হাত ধরেছিল। বাইরে তখন শ্রাবণের তুমুল বৃষ্টি, আর আমার হাতের তালু ভিজে উঠছিল ওর হাতের নরম ঘামে। আমি শুধু চেয়েছিলাম এই বৃষ্টি কোনোদিন না থামুক, এই ট্রাফিক জ্যাম কোনোদিন শেষ না হোক। সেই লেখার নিচে নীল কালির একটা হালকা দাগ ছড়িয়ে গেছে, হয়তো কোনো অশ্রুবিন্দু পড়ে কালিটা ধুয়ে গিয়েছিল।
সেই দিনের কথা পড়তে পড়তে আমার মনে হলো, ওই যে মানুষটা ওই পৃষ্ঠায় লিখেছিল, সে কি সত্যি আমি ছিলাম? এত আবেগ, এত তীব্র উন্মাদনা কি কোনো মানুষের পক্ষে ধারণ করা সম্ভব? আজ সেই দিনের আমি আর বর্তমানের আমিতে কত আসমান-জমিন তফাত। বর্তমানের আমি এক ক্লান্ত, উদাসীন প্রৌঢ়ের মতো হয়ে গেছি, যার রক্তে কোনো ঢেউ নেই, যার চোখে কোনো স্বপ্ন নেই। ডায়েরির সেই পাতাগুলো যেন আমাকে তিরস্কার করে বলে ওঠে: তুই নিজের সাথে এত বড় প্রতারণা কীভাবে করলি? তুই তো এমন ছিলি না!
হলদেটে পাতায় লেখা ছিল এক অনন্ত বসন্তের গান,
যেখানে সমর্পণ করেছিলাম আমার সমগ্র আত্মসম্মান।
নীল কালির দাগে আজও ভিজে আছে শ্রাবণের বৃষ্টিজল,
সময়ের স্রোতে ভেসে গেছে সেই সমস্ত দিনের কোলাহল।কত স্বপ্ন বুনেছিলাম এই নশ্বর ভঙ্গুর পাতার গায়,
আজ সব হারিয়ে গেছে জীবনের নিষ্ঠুর এক খেলায়।
যে হাতের স্পর্শ নিয়ে লিখেছিলাম এই গোপন কবিতা,
সে হাত আজ অন্য কারো কপালে পরায় মঙ্গলজ্যোতি আর চিতা।ডায়েরির পাতা বন্ধ করে দিই তীব্র এক যন্ত্রণার ভয়ে,
অতীত ফিরে আসে বারবার আমার বর্তমানকে ক্ষয়ে।
পোড়াতে পারিনি যাকে তাকে কেন সাজিয়ে রাখি আলমারিতে?
স্মৃতিরা কি কেবল জন্ম নেয় আত্মদহনের আগুনে পুড়িতে?।
আমি ডায়েরিটা সশব্দে বন্ধ করে দিই। ঘরের ভেতর ধুলোর একটা সূক্ষ্ম মেঘ উড়ে যায়। ফেলে দেওয়া অতীতকে আবার টেনে এনে সামনে দাঁড় করালে কোনো লাভ হয় না, তাতে কেবল বর্তমানের শূন্যতাটা আরও বেশি উপহাস করে। কিন্তু মানুষ বড় অবুঝ প্রাণী, সে বারবার নিজের ক্ষতের ওপর হাত বোলায়, দেখতে চায় ক্ষতটা কতটা গভীরে গেছে।
আমি ডায়েরিটা আবার সেই ন্যাপথলিনভরা তাকের ভেতর ঢুকিয়ে রাখি। ওটা ওখানেই থাকুক। হয়তো আরও কুড়ি বছর পর, যখন আমার মাথার সমস্ত চুল সাদা হয়ে যাবে আর দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসবে, তখন কোনো এক নিঃসঙ্গ শীতের দুপুরে আমি আবার ওটা বের করব। তখন হয়তো আর রক্তক্ষরণ হবে না, তখন কেবল এক ম্লান হাসি দিয়ে আমি সেই পৃষ্ঠাগুলোকে বিদায় জানাতে পারব। সেই দিনের অপেক্ষায় আমি ডায়েরির ওপর ধুলো জমতে দিই।