অধ্যায় ০৬ফোনের নীল আলো ও নিভে যাওয়া একটি নাম
নিস্তব্ধতার মাঝে একা জেগে থাকার দীর্ঘশ্বাস
অন্ধকার ঘরের ভেতর সেলফোনের স্ক্রিনের নীল আলোটা কেমন ভূতুড়ে দেখায়। রাত তখন সাড়ে তিনটা। শহরের সব পাখি অনেক আগেই ঘুমিয়ে গেছে, এমনকী গলির নেড়ি কুকুরগুলোর ক্লান্ত ঘেউ ঘেউ শব্দটাও থেমে গেছে। ঘরের ভেতরে একমাত্র শব্দ আমার নিজের নিঃশ্বাসের ওঠানামা আর টেবিল ফ্যানের মৃদু একটানা গুঞ্জন।
আমি বিছানায় শুয়ে ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকি। স্ক্রিনে তোমার নামটি ভেসে উঠছে, কিন্তু কোনো কল আসছে না। কেবল কনট্যাক্ট লিস্টের সেই পরিচিত এগারোটা ডিজিট আর তোমার একটা পুরোনো ঝাপসা প্রোফাইল ছবি। আমি আঙুলটা স্ক্রিনের ওপর রেখে দিই, ডায়াল বাটনের ঠিক এক মিলিমিটার ওপরে। মাত্র একবার স্পর্শ করলেই ওপারে রিংটোন বেজে উঠবে। হয়তো তোমার ঘুম ভেঙে যাবে, হয়তো তুমি বিরক্তি নিয়ে ফোনের আলোটা দেখবে, হয়তো বা কোনো কথাই বলবে না।
কিন্তু আমি ডায়াল করতে পারি না। আঙুলটা ওখানেই কাঁপতে থাকে। এই সামান্য প্লাস্টিক আর কাচের স্ক্রিনটার মাঝখানে আসলে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক হাজার মাইল চওড়া এক অহংকার আর আত্মমর্যাদার খাদ। তুমি আমাকে নিষেধ করোনি কল দিতে, কিন্তু তোমার সেই শেষ বারের শীতল কথাগুলো মনে পড়লে আমার কলিজার ভেতর বরফ জমে যায়। তুমি বলেছিলে, অহেতুক পুরোনো কথা টেনে এনে কী লাভ?
একটি মানুষ কত নির্মমভাবে বলতে পারে এই কথাটি। যার কাছে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল বাঁচার একমাত্র রসদ, তাকে কত সহজেই শুনিয়ে দেওয়া হলো যে এগুলো সবই অহেতুক। আমি ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরে চোখ বন্ধ করি। নীল আলোটা নিভে যায়, আর সাথে সাথেই ঘরটা আরও কয়েক গুণ বেশি ঘন অন্ধকারে ডুবে যায়। এই অন্ধকার আসলে ঘরের নয়, এই অন্ধকার সেই মানুষটার যার সমস্ত যোগাযোগের পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেছে।
নীল আলো জ্বলে ওঠে মুঠোফোনের ঠান্ডা স্ক্রিনের গায়,
যে নামটা লেখা আছে সে তো আজ অচেনা ছায়ায়।
একটিমাত্র স্পর্শ করলেই বেজে উঠত ওপাশের সুর,
অথচ মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্ত নিঃশব্দ দূর।কত কথা জমানো ছিল এই বুকের নিভৃত গুহায়,
সব কথা জমে রইল আত্মদহনের গোপন ব্যথায়।
তুমি তো ঘুমিয়ে আছো নিশ্চিন্তে কোনো এক শান্ত ঘরে,
আর আমার প্রতিটি রাত কাটে বিষাক্ত স্মৃতি মন্থন করে।আলোটা নিভে গেল, অন্ধকার গ্রাস করল আমার সমস্ত সত্তা,
আমি চিনে নিলাম আমার এই পরাজিত জীবনের নিঃস্বতা।
কোনোদিন আর সেই নম্বরে যাবে না আমার কোনো ডাক,
স্মৃতিটুকু পাথরের মতো বুকের গভীরেই চাপা থাক।
মানুষ আধুনিক হয়েছে, তারা হাজার মাইল দূর থেকেও মুহূর্তের মধ্যে কথা বলতে পারে। কিন্তু মানুষ কি আগের চেয়ে বেশি একা হয়ে যায়নি? প্রযুক্তির এই যুগে একটা বোতাম চাপলেই যোগাযোগ মুছে ফেলা যায়, ব্লক করে দেওয়া যায়, প্রোফাইল ডিলিট করে দেওয়া যায়। কিন্তু মস্তিষ্কের নিউরনে যে মুখটা স্থায়ীভাবে খোদাই হয়ে গেছে, তাকে ব্লক করার মতো কোনো বোতাম তো ঈশ্বর আবিষ্কার করেননি।
আমি ফোনটা টেবিলের ওপর উপুড় করে রাখি। আর তাকাব না ওটার দিকে। যদি কোনোদিন তোমার মনে পড়ে, যদি কোনো অলৌকিক রাতে তোমার ঘুম ভেঙে গিয়ে এই এগারোটা ডিজিটের কথা মনে পড়ে, তবে তুমি নিজেই কল দিও। আমি কোনো অভিযোগ করব না, কোনো কারণ জানতে চাইব না। শুধু একবার তোমার কণ্ঠটা শুনব, যেন নিশ্চিত হতে পারি এই পৃথিবীতে আমি কোনো মরীচিকার পেছনে ছুটে জীবনটা শেষ করে দিইনি। তারপর ভোর হবে, আর আমি আবার মানুষের ভিড়ে অচেনা হয়ে মিশে যাব।