পর্ব ১: রক্তমাংসের পরাজয় ও গোপন ক্ষত

অধ্যায় ০৯তোমার না-থাকার শব্দ

শূন্যতাও যে এত তীব্র শব্দে বাজতে পারে

৫ মিনিট পাঠ

শব্দ কেবল উচ্চারিত হলেই শোনা যায় না, তীব্রতম শব্দ জন্ম নেয় যখন সবকিছু আচমকা থেমে যায়। মানুষ যখন ভিড়ের মধ্যে থাকে, তখন সে কোনো শব্দ শুনতে পায় না, সে কেবল কোলাহল ভোগ করে। কিন্তু যখন সে কোনো এক শূন্য ঘরে একা এসে দাঁড়ায়, তখন সেই ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে এক অদ্ভুত গর্জন শুনতে পাওয়া যায়। সেই গর্জন হলো অনুপস্থিতির।

তোমার চলে যাওয়ার পর আমার এই ঘরটা এক অদ্ভুত জাদুঘরে পরিণত হয়েছিল। টেবিলের ওপর তোমার রেখে যাওয়া আধখাওয়া কাচের জলের গ্লাস, ড্রেসিংটেবিলের কোণে পড়ে থাকা একটা পুরোনো চুলের ক্লিপ, আর আলমারির হাতলে ঝুলতে থাকা একটা সুতোছেঁড়া ওড়না। এই সামান্য জিনিসগুলো সারাদিন সম্পূর্ণ চুপচাপ থাকে, কিন্তু মাঝরাতে আলো নিভিয়ে দিলেই তারা চিৎকার করতে শুরু করে। তারা যেন একযোগে বলে ওঠে: সে নেই, সে আর কোনোদিন আসবে না।

না-থাকা যে এত বড় একটা শারীরিক উপস্থিতি হতে পারে, তা আমি তোমাকে হারানোর আগে বুঝিনি। মনে হতো ঘরের প্রতিটি কোণে, খাটের চাদরের প্রতিটি ভাঁজে, এমনকী বাতাসে ভাসমান ধূলিকণাগুলোর মধ্যেও তোমার না-থাকাটা একটা অদৃশ্য পাহারা বসিয়ে রেখেছে। আমি হাত বাড়ালে বাতাস ছুঁই, কিন্তু মনে হয় আমি তোমার না-থাকার এক জমাট বরফ ছুঁয়ে ফেললাম।

মানুষ কান ঝালাপালা করা শব্দ সহ্য করতে পারে, কিন্তু এই বোবা নৈশব্দ সহ্য করা মানুষের ক্ষমতার বাইরে। কখনো কখনো এই নিস্তব্ধতার হাত থেকে বাঁচার জন্য আমি নিজেই নিজের সাথে জোরে জোরে কথা বলে উঠতাম, কিংবা ঘরের রেডিওটা তীব্র আওয়াজে চালিয়ে দিতাম। কিন্তু গানের সুর থামার সাথে সাথেই সেই শূন্যতার দৈত্যটা আবার হাঁ করে আমার সামনে এসে দাঁড়াত। সে আমাকে মনে করিয়ে দিত, পৃথিবীর সমস্ত সঙ্গীত মিলেও তোমার ফেলে যাওয়া এই হাহাকারটুকু পূরণ করতে পারবে না।

নিস্তব্ধ ঘরের কোণে জমে আছে তোমার না-থাকার সুর,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে বাজে সেই একাকীত্বের নূপুর।
দেয়ালগুলো চেয়ে থাকে বোবা এক পাথরের মতন,
এই বুকে লুকিয়ে আছে শতাব্দীর প্রাচীন রক্তক্ষরণ।

কত কোলাহল ছিল একদিন এই ছোট আঙিনায়,
আজ সব হারিয়ে গেছে এক অচেনা কালবোশেখির ছায়ায়।
শূন্যতা চিৎকার করে বলে ওঠে তুমি নেই কোথাও,
নদীর বুক থেকে চলে গেছে যেন চিরতরে শেষ নাও।

আমি দুই কানে হাত চেপে ধরি এই তীব্র চিৎকারের ভয়ে,
বেঁচে আছি শুধু এক নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসের ভার বয়ে।
যে মানুষ নেই তার চেয়ে বড় উপস্থিতি আর কী হতে পারে?
সে যে রক্ত হয়ে আজও ঝরে এই পোড়া হৃদয়ের দ্বারে।

আজ আমি আর সেই নিস্তব্ধতাকে ভয় পাই না। আমি তার সাথে সন্ধি করে নিয়েছি। আমি জেনেছি, শূন্যতা আসলে কোনো অভাব নয়, শূন্যতা হলো স্মৃতির এক সুবিশাল পাত্র। যেখানে কিছুই নেই, সেখানেই সবকিছু ধরে রাখা যায়। যদি আমার জীবনটা প্রতিদিনের সাংসারিক আনন্দে পূর্ণ থাকত, তবে হয়তো তোমার এই স্মৃতিটুকু ধারণ করার কোনো জায়গা হতো না।

তাই এই শূন্যতাকেই আমি আমার অহংকার বানিয়ে নিয়েছি। এই না-থাকার শব্দের ভেতরেই আমি তোমার কণ্ঠস্বর খুঁজে পাই। যখন বাতাস এসে আমার জানলার পর্দা নাড়িয়ে দিয়ে যায়, আমি মনে করি তুমি এইমাত্র আমার পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে। যে ভালোবাসায় কোনো প্রাপ্তি নেই, সে ভালোবাসার একমাত্র ভাষা হলো এই নিঃশব্দতা। আমি সেই নিঃশব্দতার উপাসক হয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে প্রস্তুত।