পর্ব ১: রক্তমাংসের পরাজয় ও গোপন ক্ষত

অধ্যায় ০৫ট্রামের জানালায় রেখে আসা চোখ

চলে যাওয়ার দৃশ্যে কোনো অলৌকিক সান্ত্বনা থাকে না

৫ মিনিট পাঠ

কলকাতার ধর্মতলার মোড়ে ট্রামের ধাতব চাকার ঘর্ষণে যে তীক্ষ্ণ শব্দ তৈরি হয়, তার ভেতর কেমন এক প্রাচীন কান্নার সুর লুকিয়ে থাকে। সেদিন বিকেলে আকাশে এক ফোঁটাও মেঘ ছিল না, অথচ রোদটা ছিল বড় বিবর্ণ, যেন মৃত্যুর আগের মুহূর্তে কোনো বৃদ্ধের ফ্যাকাসে চোখের চাউনি। তুমি ট্রামের কাঠের সিটে বসেছিলে, তোমার খোলা জানলার বাইরে আমি দাঁড়িয়েছিলাম ফুটপাথের ধুলোবালির ওপর।

ট্রামটা ছাড়তে তখনও মিনিট দুয়েক বাকি ছিল। আমরা কেউ কোনো কথা বলছিলাম না। কথা বলার সময় অনেক আগেই পার হয়ে গিয়েছিল। মানুষ যখন নিশ্চিতভাবে জেনে যায় যে এরপর আর কোনোদিন দেখা হবে না, তখন যেকোনো সান্ত্বনার বাক্যই অত্যন্ত হাস্যকর আর অশ্লীল শোনায়। তুমি কেবল জানলার লোহার শিকে হাত রেখে তাকিয়ে ছিলে আমার দিকে। তোমার সেই চোখের দৃষ্টিতে কোনো রাগ ছিল না, কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল কেবল এক অনন্ত মহাসমুদ্রের মতো শান্ত বিষাদ।

হঠাৎ কনডাক্টরের ঘণ্টার তীক্ষ্ণ আওয়াজ বেজে উঠল। ট্রামটা মৃদু একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল। কাঠের চাকাগুলো লোহার রেলের ওপর দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দে এগিয়ে চলল। তুমি মুখ ফিরিয়ে নিলে না। জানলা দিয়ে তোমার মুখটা ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল, যেমন করে নদী থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যায় একটা নিঃসঙ্গ পালতোলা নৌকা। তোমার চোখ দুটো তখনও আটকে ছিল আমার চোখের ভেতর।

আমি এক পা-ও এগোইনি। ট্রামের পেছনে দৌড়ে যাওয়ার মতো বোকামি আমি করিনি। আমি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, কীভাবে একটি জলজ্যান্ত মানুষ ধীরে ধীরে একটা ক্ষুদ্র বিন্দুতে পরিণত হয়, এবং তারপর ধোঁয়া আর ট্রাফিকের ঘূর্ণিপাকের ভেতর চিরতরে হারিয়ে যায়। সেই শেষ দৃষ্টিটা আমার চোখের তারায় এমনভাবে গেঁথে গেল যে আজও চোখ বন্ধ করলেই আমি সেই চলমান ট্রামের জানলা আর কাঠের রিংয়ের ফাঁক দিয়ে তোমার মুখটা স্পষ্ট দেখতে পাই।

ট্রামের চাকার শব্দে মিশে গেল আমার শেষ আরতি,
তুমি চলে গেলে দূরে, ভেঙে দিয়ে আমার সমস্ত আর্তি।
জানলার শিকে রাখা ছিল তোমার শীর্ণ একখানা হাত,
তারপর নেমে এলো শতাব্দী প্রাচীন এক অন্ধকার রাত।

কোনো সান্ত্বনা নেই এই চলে যাওয়ার দৃশ্যপটে,
সব ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত এভাবেই ধূলিসাৎ ঘটে।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম ফুটপাথে এক স্তম্ভিত পাথরের মতো,
বুকের ভেতর ছড়িয়ে গেল এক অনন্ত রক্তক্ষয়ী ক্ষত।

বিদায়ের পর আর কোনো সংলাপের প্রয়োজন থাকে না,
যে চলে যায় সে তো পেছনের ছায়াকে মনে রাখে না।
তবু সেই ট্রামের জানালায় আজও আমার চোখ রয়ে গেছে,
যে চোখ তোমার বিদায়ে চিরদিনের মতো নিঃস্ব হয়েছে।

চলে যাওয়াটা কত সহজ, অথচ দাঁড়িয়ে থাকাটা কত দুঃসহ। যারা চলে যায়, তারা পথ দেখতে দেখতে যায়, তাদের সামনে নতুন গন্তব্য থাকে, নতুন মোড় থাকে। কিন্তু যে মানুষটা প্ল্যাটফর্মে বা ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকে, তার চারপাশের সমস্ত পৃথিবী এক লহমায় নিশ্চল হয়ে যায়। বাতাসটা তখন থেমে যায়, সময় থমকে দাঁড়ায়, আর মানুষের পায়ের তলার মাটি ধীরে ধীরে আলগা হতে থাকে।

আজ এত বছর পরেও যখনই কোথাও কোনো ট্রাম বা ট্রেনের হুইসেল শুনি, আমার বুকের বাঁ পাশটায় এক অজানা চিনচিনে ব্যথা জেগে ওঠে। মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত রেললাইন আসলে একটাই বিচ্ছেদের দিকে ছুটে চলেছে। ঈশ্বর হয়তো চেয়েছিলেন আমাকে এই চলে যাওয়ার দৃশ্যটা দেখিয়ে বুঝিয়ে দিতে যে মানুষের কোনো স্থায়িত্ব নেই। কিন্তু আমি জানি, ট্রামটা চলে গেলেও তোমার সেই শান্ত চোখের চাউনি আজও সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। সেই চাউনির কাছে মহাকালের সমস্ত ট্রাম চিরতরে পরাভূত।