পর্ব ৩: দর্শনের পরাজয় ও প্রেমের উন্মেষ

অধ্যায় ২১আমি জ্ঞানী হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু প্রেমিক হয়ে রইলাম

সমস্ত দর্শনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা তোমার একটি হাসির কাছে

৫ মিনিট পাঠ

আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বছরগুলো ব্যয় করেছিলাম দর্শনের গভীর জটিলতার গোলকধাঁধায়। টেবিলের ওপর সাজিয়ে রেখেছিলাম শোপেনহাওয়ার, নিৎশে, স্পিনোজা আর নাগার্জুনের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম যে মানুষ যদি নিজেকে欲望 আর মোহ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে নিতে পারে, তবে সে সমস্ত পার্থিব যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে উঠে যেতে পারে। এক ধরনের বৌদ্ধিক অহংকার আমার মজ্জায় মজ্জায় ঢুকে গিয়েছিল। ভাবতাম আমি সাধারণ মানুষের মতো ক্ষুদ্র আবেগের দাস নই।

ক্যান্টের বিশুদ্ধ বিচারবুদ্ধির তত্ত্ব পড়তে পড়তে আমি রাত কাবার করে দিতাম। নিজেকে একজন অবিচল তপস্বী মনে হতো, যে আবেগের উত্তাল সমুদ্রের পারে এক অভেদ্য পাথুরে বাতিঘরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বন্ধুদের বলতাম, মন খারাপ এক রাসায়নিক ত্রুটি মাত্র, আর প্রেম হলো প্রকৃতির এক স্থূল কৌশল যার একমাত্র উদ্দেশ্য প্রজাতি রক্ষা করা। কিন্তু মানুষ যখন দর্শনের দুর্গে বসে মহাবিশ্বকে শাসন করার স্বপ্ন দেখে, তখন ঈশ্বর হয়তো এক কোণে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কৌতুকের হাসি হাসেন।

একদিন বিকেলে তুমি যখন এক কাপ চা হাতে নিয়ে আমার টেবিলের পাশে এসে দাঁড়ালে, তখন আমার সমস্ত তত্ত্ব তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। তোমার মুখে ছিল সেই স্বভাবসুলভ অনাবিল হাসি, আর হাতে ধরা চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল। তুমি আমার ভারী বইটার পাতা ছুঁয়ে বললে, এত কঠিন কথা পড়ে কী লাভ বলো তো, যদি মুখের হাসিটাই হারিয়ে যায়?

সেই একটিমাত্র কথা, আর তোমার সেই অমলিন হাসির সহজ আলো। নিমেষে মনে হলো স্পিনোজার সমস্ত ঈশ্বরতত্ত্ব, নিৎশের সমস্ত অতিমানব আর শোপেনহাওয়ারের সমস্ত নৈরাশ্যবাদ এক নিমিষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। আমি বুঝতে পারলাম, মানুষ জ্ঞান দিয়ে কোনোদিন মুক্তি পেতে পারে না। জ্ঞান মানুষকে কেবল অহংকারী একাকীত্ব উপহার দেয়, কিন্তু প্রেম মানুষকে উপহার দেয় নিজের অহংকার বিসর্জন দেওয়ার মতো এক পবিত্র আনন্দ। আমি সেই বিকেলেই দর্শনের দাসত্ব ত্যাগ করে তোমার প্রেমের এক নতজানু ভিখারি হয়ে গেলাম।

হাজার পৃষ্ঠার বই পড়ে ভেবেছিলাম হয়ে গেছি এক মস্ত জ্ঞানী,
জগতের সব মিথ্যার মুখোশ নিমেষে দিতে পারি আমি টানি।
নিৎশে আর শোপেনহাওয়ার ছিল আমার নিত্যদিনের সঙ্গী সাথী,
নিজেকে ভাবতাম এক নিঃসঙ্গ বাতিঘরের জ্বলন্ত বাতি।

কিন্তু তোমার একটি হাসির আলোয় খসে পড়ল সমস্ত বইয়ের ভার,
নিমেষে চূর্ণ হয়ে গেল আমার বহুদিনের বুদ্ধিবৃত্তিক অহংকার।
কী হবে অত দর্শন জেনে যদি বুকের ভেতরেই জমে থাকে শীত?
তোমার চোখের তারায় লুকিয়ে ছিল আমার আসল প্রেমের গীত।

পণ্ডিত হতে চেয়েছিলাম এই মূর্খ পৃথিবীর বিচারসভায় দাঁড়িয়ে,
অথচ আজ আমি নিঃস্ব প্রেমিক সব পাণ্ডুলিপি দূরে মাড়িয়ে।
জ্ঞানের চেয়ে অনেক বড় এক ফোঁটা ভালোবাসার উষ্ণ জল,
যার কাছে পরাভূত হয়ে গেছে আমার সমস্ত বুদ্ধির বল।

আজ আমার বুকশেলফের বইগুলোর দিকে তাকালে মায়া হয়। অত বড় বড় দার্শনিকেরা কত শত পৃষ্ঠা খরচ করেছেন মানুষের দুঃখের কারণ ব্যাখ্যা করতে। অথচ উত্তরটা কত সহজ ছিল। দুঃখ তো আসে না অজ্ঞতা থেকে, দুঃখ আসে প্রেমহীনতা থেকে। যে মানুষ কাউকে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসতে শেখেনি, তার সমস্ত জ্ঞানই হলো শূন্য মরুভূমির বালুকাঝড়।

আমি আর জ্ঞানী হতে চাই না। আমি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়ে সম্মান পেতে চাই না। আমি কেবল তোমার সেই একজন প্রেমিক হয়েই বেঁচে থাকতে চাই, যে তোমার চলে যাওয়ার পরেও তোমার স্মৃতির চরণে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব সমর্পণ করে দিয়েছে। এই পরাজয়ের ভেতরেই আমার পরম সার্থকতা, এই নতজানু অবস্থার ভেতরেই আমার আসল মুক্তি।