পর্ব ২: কুয়াশা, স্মৃতি ও অসমাপ্ত কথন

অধ্যায় ১৩বুকের বাঁ পাশের সেই অদৃশ্য পাথর

অভ্যাসে পরিণত হওয়া ব্যথার কোনো নিরাময় থাকে না

৫ মিনিট পাঠ

ডাক্তাররা বলে মানুষের হার্ট একটা পাম্পিং মেশিনের মতো। সেখানে চারটে চেম্বার থাকে, ভালভ থাকে, রক্ত চলাচল করে অক্সিজেন আর কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিনিময় ঘটাতে। ইসিজি মেশিনের গ্রাফ পেপারে সেই স্পন্দনের ওঠা-নামা দেখে তারা বলে দেয় মানুষ সুস্থ আছে কি না। অথচ কোনো আধুনিক মেডিকেল বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত মেপে দেখতে পারেনি, একজন মানুষের বুকের বাঁ পাশে যে এক অদ্ভুত ভারী পাথর চেপে বসে থাকে, তার আসল ওজন কত মিলিগ্রাম।

সেই পাথরটা সবসময় ব্যথা দেয় না। দিনের বেলা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার সময়, কাজের টেবিলে সহকর্মীদের সাথে হাসাহাসি করার সময় মনে হয় পাথরটা যেন নেই। আপনি সাধারণ মানুষের মতোই স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন, চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। কিন্তু যেই মুহূর্তটিতে আপনি একটু অন্যমনস্ক হন, কিংবা রেডিওতে হঠাৎ একটা চেনা সুর বেজে ওঠে, অমনি সেই অদৃশ্য পাথরটা তার সমস্ত ওজন নিয়ে বুকের ওপর চেপে বসে। তখন প্রতিটি নিঃশ্বাস নিতে গেলে মনে হয় পাঁজরের হাড়গুলো মটমট করে ভেঙে যাচ্ছে।

মানুষের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, সে ব্যথায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রথমে যে ব্যথা মানুষকে পাগল করে দিত, যে ব্যথায় মানুষ বালিশে মুখ গুঁজে রাতভর কাঁদত, কয়েক বছর পর সেই ব্যথাই তার স্বাভাবিক অবস্থা হয়ে দাঁড়ায়। তখন আর কান্না আসে না, চোখ দুটো শুকনো কাঠের মতো খটখট করে। মানুষ তখন বুঝতে পারে, তার ভেতরের কোনো এক অংশ স্থায়ীভাবে মারা গেছে, আর সেই মৃত অংশের পচনশীল গন্ধটাই সে সারাদিন বহন করে নিয়ে বেড়াচ্ছে।

আমি কত ওষুধ খেয়েছি, কত রাত ঘুমোনোর জন্য ঘুমের ট্যাবলেটের আশ্রয় নিয়েছি। কিন্তু রসায়নের কোনো পিল তো স্মৃতিকে ধুয়ে ফেলতে পারে না। স্মৃতি যদি একবার পেশির কোষে ঢুকে পড়ে, তবে তাকে নির্মূল করতে হলে গোটা শরীরটাকেই চিতার আগুনে ছাই করে দিতে হয়। আমি সেই আগুন ছাড়া আর কোনো মুক্তির পথ দেখতে পাইনি।

বুকের বাঁ পাশে চেপে আছে এক প্রকাণ্ড কালো পাথর,
যার চাপে প্রতিটি নিঃশ্বাস হয়ে ওঠে রক্তাক্ত কাতর।
ডাক্তার দেখে না সেই ক্ষত, কোনো যন্ত্রে ধরা পড়ে না রোগ,
এ যে আমার আজন্মের এক অলৌকিক বিষাক্ত ভোগ।

কত দিন কেটে গেল স্বাভাবিক মানুষের মতো ভান করে,
ভেতরে ভেতরে পুড়ে ছাই হলাম নিভৃত অন্ধকারের ঘোরে।
ব্যথাই তো আজ আমার পরিচয়, ব্যথাই তো আমার অলংকার,
এই অভ্যাসের কাছে পরাভূত পৃথিবীর সমস্ত সংসার।

কোনো মলম নেই এই ক্ষতের, নেই কোনো জাদুকরি জল,
ভালোবাসা ফেলে রেখে গেছে কেবল এক নিষ্ঠুর অতল।
আমি বয়ে নিয়ে যাব এই পাথর যতদিন দেহে আছে প্রাণ,
এই নীরব বহনই হোক আমার নিঃস্ব জীবনের জয়গান।

আজ আমি আর সেই পাথরটাকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করি না। আমি তাকে আমার শরীরের একটা নতুন অঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছি। যখন সে ভারী হয়ে ওঠে, আমি বুঝি যে আমার ভেতরে এখনও কিছু অনুভূতি বেঁচে আছে। যে অনুভূতিহীন হয়ে গেছে সে তো মৃতদেহের সমান, কিন্তু যার বুকের বাঁ পাশে পাথর চেপে আছে, সে অন্তত জানে যে সে একদিন কাউকে নিখাদভাবে ভালোবেসেছিল।

এই সচেতনতাই তো মানুষের শ্রেষ্ঠ সান্ত্বনা। যে মানুষ কোনোদিন কাউকে ভালোবেসে নিঃস্ব হয়নি, সে এই পৃথিবীর কোনো সৌন্দর্যকেই পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি। তার জীবন এক মসৃণ কিন্তু অগভীর জলাশয়ের মতো। আর আমার জীবন এক গভীর ক্ষতবিক্ষত গিরিখাত, যার অন্ধকার তলদেশে আজও তোমার স্মৃতির স্ফটিক পাথরটা জ্বলজ্বল করছে। আমি সেই পাথরকে বুকে জড়িয়ে রেখেই বেঁচে থাকি।