পর্ব ৩: দর্শনের পরাজয় ও প্রেমের উন্মেষ

অধ্যায় ২৫অনাসক্তি এক করুণ মিথ্যাচার

যে হৃদয় ভালোবাসতে জানে, সে উদাসীন হতে পারে না

৫ মিনিট পাঠ

ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে অনাসক্তির পাঠ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন কর্ম করে যাও, কিন্তু ফলের আশা কোরো না; সুখে-দুঃখে সমত্ব বোধ বজায় রাখো। সনাতন ঋষিরা থেকে শুরু করে আধুনিক দার্শনিকেরা সবাই এই অনাসক্তি বা উদাসীনতাকে মানুষের শ্রেষ্ঠ মানসিক অবস্থা বলে প্রচার করে গেছেন। আমিও একসময় তাঁদের এই প্রচারণায় বিশ্বাস করে নিজেকে এক উদাসীন যোগী বানাতে চেয়েছিলাম।

ভেবেছিলাম কোনো কিছুতেই আমি আর বিচলিত হব না। কেউ চলে গেলে কাঁদব না, কেউ ফিরে এলে হাসব না। সবকিছুকে এক অলীক মায়ার খেলা বলে উড়িয়ে দেব। কিন্তু জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতার আগুনে পুড়ে আজ আমি বুঝতে পারছি, এই অনাসক্তি আসলে মানুষের এক চরম ভণ্ডামি আর কাপুরুষতার আবরণ। মানুষ যখন ভালোবাসার প্রচণ্ড আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তখন সে এই অনাসক্তির ভেক ধরে নিজের দুর্বলতাকে মহৎ বলে জাহির করতে চায়।

যে হৃদয় সত্যি ভালোবাসতে জেনেছে, সে কোনোদিন উদাসীন হতে পারে না। আপনি যদি কাউকে নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে ভালোবেসে থাকেন, তবে তার সামান্যতম কষ্টে আপনার বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠবেই। সে যদি দূরে চলে যায়, আপনার চোখ দিয়ে রক্তাশ্রু ঝরবেই। একে অস্বীকার করা মানে প্রকৃতির পরম নিয়মকেই অস্বীকার করা। আমি রক্তমাংসের মানুষ, কোনো পাথুরে বুদ্ধমূর্তি নই।

আমার রাগ হয়, আমার হাহাকার জাগে, আমার একাকীত্বে বুক ফেটে কান্না আসে। আর এই সমস্ত কিছুকে আমি আজ প্রকাশ্যে স্বীকার করি। আমি আর কোনো অনাসক্তির মুখোশ পরব না। আমি বলব, হ্যাঁ, আমি তোমায় চেয়েছিলাম, আমি আজও তোমায় চাই, এবং এই না-পাওয়ার তীব্র যন্ত্রণাকে আমি আমার সমস্ত অহংকার দিয়ে ভোগ করব। এই স্বীকারোক্তির ভেতরে যে মুক্তি আছে, তা কোনো নকল বৈরাগ্যের ভেতর নেই।

অনাসক্তির ভান করে কাটিয়েছিলাম জীবনের কত মিথ্যা প্রহর,
ভেবেছিলাম পাথর হয়ে বেঁচে থাকাটাই হয়তো পরম গৌরবের শহর।
কিন্তু যে হৃদয় ভালোবাসতে জানে সে কি কোনোদিন উদাসীন হতে পারে?।
তার প্রতিটি রক্তবিন্দু যে কাঁদে নিভৃত অন্ধকার কারাকারে।

বৈরাগ্য তো কাপুরুষের আশ্রয়, যে পালিয়ে বাঁচতে চায় রণে,
আমি তো দাঁড়িয়েছি বীরের মতো এই তীব্র ভালোবাসার বনে।
যদি জ্বলে যায় সমস্ত সত্তা, যদি ছাই হয়ে যায় আমার এই ঘর,
তবুও বলব তোমাকেই চেয়েছিলাম আমি আজন্ম আপন ও পর।

মিথ্যা গীতার শ্লোক আর নকল বৈরাগ্যের এই ব্যবসা চুকিয়ে,
আমি নেমে এলাম প্রেমের অতল সমুদ্রে সমস্ত অহংকার লুকিয়ে।
দহনই আমার ধর্ম হোক, অশ্রুই হোক আমার নিত্যদিনের গান,
ভালোবেসে নিঃস্ব হওয়াতেই নিহিত মানুষের আসল আত্মসম্মান।

আজ আমি নিজেকে এই মিথ্যাচারের কারাগার থেকে মুক্ত ঘোষণা করলাম। যারা বলে তারা সবকিছুতে শান্ত থাকে, তারা আসলে কোনোদিন গভীরভাবে কিছুকে ভালোবাসতেই পারেনি। গভীর ভালোবাসা মানুষকে শান্ত করে না, সে মানুষকে এক ভয়ংকর সামুদ্রিক ঝড়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সেই ঝড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার সাহস যার আছে, কেবল সেই ভালোবাসার আসল রূপ দেখতে পায়।

আমি ভেঙেছি, কিন্তু আমি সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। তোমার প্রতি আমার এই প্রেম কোনোদিন শান্ত হবে না, কোনোদিন অনাসক্ত হবে না। সে অনন্তকাল ধরে জ্বলবে এক জীবন্ত মশালের মতো। ঈশ্বর যদি আমাকে এই আসক্তির জন্য নরকে পাঠান, আমি সেই নরকে গিয়েও তোমার নাম নিয়ে চিৎকার করব। কারণ মিথ্যে স্বর্গের চেয়ে এই সত্য নরক অনেক বেশি সম্মানজনক।