অধ্যায় ৩৬বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাওয়া শেষ মানচিত্র
যেখানে হারানোর আর কোনো অবশিষ্ট চিহ্ন থাকে না
ভাদ্রের এক শেষ বিকেলে এমন এক পশলা বৃষ্টি নামল যা এই শহরের সমস্ত রূপ বদলে দিল। আমি একটা পুরোনো কাগজের মানচিত্র নিয়ে বসেছিলাম টেবিলে। সেই মানচিত্রে লাল কালির গোল দাগ দেওয়া ছিল কতগুলো চেনা জায়গায়: ধানমন্ডির লেকের সেই মেহগনি গাছের তলা, টিএসসির ক্যাফেটেরিয়ার পেছনের বাগান, আর নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের গলি। এই জায়গাগুলো ছিল আমাদের যৌথ স্মৃতির একেকটি দুর্গ।
হঠাৎ জানলার পাল্লা বাতাসে সশব্দে খুলে গেল। এক ঝলক দমকা হাওয়ার সাথে সাথে বৃষ্টির একরাশ জল টেবিলের ওপর আছড়ে পড়ল। মানচিত্রের কাগজটা মুহূর্তে ভিজে চুপচুপে হয়ে গেল। লাল কালির গোল দাগগুলো জলের তোড়ে গলে গিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। যেন রক্তমাখা কিছু অশ্রুবিন্দু কাগজের শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। আমি মানচিত্রটা বাঁচাতে হাত বাড়ালাম না।
আমি চেয়ে চেয়ে দেখলাম কীভাবে শহরের রাস্তাগুলো, নদীর রেখাগুলো আর আমাদের সেই গোপন স্মৃতির দাগগুলো একে অপরের সাথে মিশে গিয়ে এক বিমূর্ত নীল-লাল ছোপ তৈরি করল। কিছুক্ষণ পর আর কোনো জায়গাকে আলাদা করে চেনার উপায় রইল না। ধানমন্ডি মিশে গেল পুরান ঢাকায়, টিএসসি মিলিয়ে গেল বুড়িগঙ্গার কাল্পনিক সীমানায়। মানচিত্রটা তার সমস্ত ভৌগোলিক সত্য হারিয়ে কেবল এক টুকরো ভিজে নরম মণ্ডে পরিণত হলো।
হারানোর যখন আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না, তখন মানুষের ভয় পুরোপুরি কেটে যায়। আমরা স্থানকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই, ভাবি ওই বিশেষ গাছটা বা ওই বিশেষ বেঞ্চটাতেই বুঝি প্রেম বন্দি ছিল। কিন্তু বৃষ্টির জল আমাকে দেখিয়ে দিল যে স্থান হলো নশ্বর, তাকে যে কোনো মুহূর্তে প্রাকৃতিক নিয়মে মুছে ফেলা যায়। কিন্তু যে ভালোবাসা ওই স্থানগুলোকে একসময় আলো দিয়েছিল, সে তো কোনো কাগজের মানচিত্রে আঁকা ছিল না, সে আঁকা ছিল আমার আত্মায়।
বৃষ্টির জলের তোড়ে ধুয়ে গেল স্মৃতির শেষ মানচিত্রখানি,
লাল কালির দাগগুলো মুছে ফেলে দিল শ্রাবণের জলবানী।
কোনো চিহ্ন রইল না আর কোথায় ছিল আমাদের চেনা পথ,
যে পথ দিয়ে একদিন ছুটেছিল এক অনন্ত স্বপ্নের রথ।স্থান তো কেবল ধূলিমলিন মাটির এক টুকরো জড় খণ্ড,
তার ভেতরে কেন খুঁজব আমি আমার ভালোবাসার ব্রহ্মাণ্ড?।
সব মুছে গেছে ভালোই হয়েছে, ঘুচেছে আঁকড়ে থাকার মোহ,
শেষ হয়ে গেল প্রকৃতির সাথে আমার আজন্মের সব বিদ্রোহ।মানচিত্রহীন হয়ে আমি আজ এক অন্তহীন আকাশের পথিক,
যেখানে কোনো সীমানা নেই, নেই কোনো নির্দিষ্ট দিক।
হারানোর ভয় যার নেই সে তো পৃথিবীর সবচেয়ে মুক্ত প্রাণ,
বৃষ্টির এই রিমঝিম শব্দেই বাজে আমার পরম মুক্তির গান।
আমি ভিজে যাওয়া কাগজের দলাটা তুলে নিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিই। ওটা নিচে কাদার ভেতর পড়ে নিমেষে মাটির সাথে মিশে গেল। কোনো আফসোস হলো না, বরং বুকের ভেতরটা এক পরম হালকা স্বস্তিতে ভরে উঠল।
এবার আমার কোনো মানচিত্রের প্রয়োজন নেই। আমি যেখানেই যাব, সেখানেই আমার ভালোবাসার তীর্থক্ষেত্র। যে মানুষ নিজের ভেতরে মন্দির গড়ে তুলেছে, তাকে আর কোনো ভৌগোলিক ঠিকানার পেছনে ছুটতে হয় না। বৃষ্টি থেমে গেছে, আকাশে এক টুকরো রামধনু দেখা দিয়েছে। আমি সেই মুক্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে এক গভীর শ্বাস নিই।