পর্ব ৪: ক্ষমা ও অনন্ত সমর্পণ

অধ্যায় ৩৮শেষ পর্যন্ত তোমাকেই ভালোবেসেছিলাম

চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক অকপট স্বীকারোক্তি

৫ মিনিট পাঠ

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ যখন পেছন ফিরে তাকায়, তখন সে নিজের কাছে আর কোনো মিথ্যা বলতে পারে না। তখন সমস্ত সামাজিক ভণিতা, সমস্ত লোকলজ্জার মুখোশ আর বুদ্ধিবৃত্তিক অহংকার শুকনো পাতার মতো খসে পড়ে। তখন কেবল একটিমাত্র চরম সত্য মানুষের সামনে আয়নার মতো এসে দাঁড়ায়: তুমি এই নশ্বর জীবনে আসলে কী করলে?

আমি কোনো বড় ব্যবসা করতে পারিনি। আমি ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা জমাতে পারিনি। আমি কোনো বিখ্যাত রাজনীতিবিদ বা নোবেলজয়ী পণ্ডিত হতে পারিনি। আমার কোনো প্রাসাদ নেই, কোনো দামি গাড়ি নেই, কোনো ভক্তের দল নেই। কিন্তু আমি জানি, আমি যদি আজ রাতে মারা যাই, আর মৃত্যুর ওপারে যদি কোনো রুক্ষ বিচারক আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কঠোর স্বরে জিজ্ঞেস করেন: এই পৃথিবীতে তোমাকে যে অমূল্য জীবনটা দিয়েছিলাম, তার কী সদ্ব্যবহার করলে?

আমি একটুও মাথা নত করব না। আমার কণ্ঠ কাঁপবে না। আমি তাঁর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে মাথা উঁচু করে শান্ত গলায় বলব: প্রভু, আমি কোনো বড় কাজ করতে পারিনি ঠিকই, আমি কোনো ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারিনি। কিন্তু আপনি যে অনন্য মানুষটিকে এই ধরাতলে পাঠিয়েছিলেন, আমি আমার সমস্ত রক্ত, সমস্ত অস্থিমজ্জা আর সমস্ত সত্তা দিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটাকেই ভালোবেসেছিলাম। কোনো শর্ত ছাড়া, কোনো প্রতিদান ছাড়া, নিঃস্বার্থভাবে।

এই একটিমাত্র স্বীকারোক্তিই আমার সমস্ত পাপকে ধুয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কারণ ভালোবাসা তো কোনো অপরাধ নয়, ভালোবাসা হলো ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির কাছে মানুষের সবচেয়ে পবিত্র নতজানু অবস্থা। যে ভালোবাসতে পেরেছে, সে স্বয়ং ঈশ্বরের অংশ হয়ে উঠেছে। আমার আর কোনো ভয় নেই। মৃত্যুর ঠান্ডা হাত যদি এখনই আমার বুকের ওপর নেমে আসে, আমি হাসিমুখে তাকে আলিঙ্গন করব।

শেষ পর্যন্ত তোমাকেই ভালোবেসেছিলাম আমার সমস্ত হৃদয় দিয়ে,
কোনো শর্ত রাখিনি কোনোদিন, বাঁচিনি কোনো প্রতিদান নিয়ে।
যদি মৃত্যু এসে দাঁড়ায় আজ আমার এই অন্ধকার দরজার কিনারায়,
হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দেব তার পরম শীতল নিবিড় ছায়ায়।

কারণ এই এক জীবনের সমস্ত অর্থ আমি পেয়ে গেছি তোমার হাসিতে,
আর কোনো অপূর্ণতা নেই আমার এই ধূলিমলিন পৃথিবীর মাটিতে।
ঈশ্বরের আদালতে দাঁড়িয়েও আমি বলব এই একটিমাত্র অকপট কথা,
তোমায় ভালোবেসে পাওয়া ধ্বংসই ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা।

কোনো অনুতাপ নেই এই বুকের বাঁ পাশে, নেই কোনো হাহাকার,
চূর্ণ হয়ে গেছে চিরতরে সমস্ত মিথ্যে পার্থিব অহংকার।
আমি কেবল এক সত্যের মশাল জ্বালিয়ে রেখে গেলাম এই রাতে,
যে মশালের আলো জ্বলে থাকবে অনন্তকাল তোমার চরণে সাথে।

মৃত্যু তো কেবল একটা শারীরিক রূপান্তর মাত্র। যে ভালোবাসা রক্তমাংসের সীমানা ছাড়িয়ে আত্মার গভীরে প্রবেশ করেছে, তাকে কোনো মৃত্যু কোনোদিন স্পর্শ করতে পারে না। সে অবিনশ্বর হয়ে মহাবিশ্বের আলো আর বাতাসের সাথে মিশে যায়।

আমি শান্ত চিত্তে আমার দুই হাত বুকের ওপর রেখে শুয়ে পড়ি। ঘরের জানলা দিয়ে এক ফালি চাঁদের আলো এসে পড়েছে আমার বিছানায়। কোনো ভয় নেই, কোনো আফসোস নেই। এই জীবনের সমস্ত ঋণ শোধ করে দিয়ে আমি আজ পরম শান্তিতে পরিপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত আমি তোমাকেই ভালোবেসেছিলাম, এই সত্যের চেয়ে বড় কোনো সান্ত্বনা আর এই মহাবিশ্বে নেই।