পর্ব ৪: ক্ষমা ও অনন্ত সমর্পণ

অধ্যায় ৩৭তোমার রেখে যাওয়া একটি পুরোনো পেন্সিল

স্মৃতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র চিহ্নের অলৌকিক অমরত্ব

৫ মিনিট পাঠ

টেবিলের ড্রয়ারের একেবারে পেছনে, কতগুলো পুরোনো রাবার ব্যান্ড আর বাতিল চাবির রিংয়ের সাথে মিশে ছিল সবুজ রঙের একটা আধভাঙা কাঠের পেন্সিল। পেন্সিলটার পেছনে যে ছোট্ট লাল ইরেজারটা থাকে, তা ঘষে ঘষে প্রায় ক্ষয়ে গেছে, আর তার কাঠের গায়ে তোমার নখের কয়েকটা স্পষ্ট খাঁজ কাটা দাগ রয়ে গেছে। তুমি যখন গভীর চিন্তায় মগ্ন হতে, তখন পেন্সিলের পেছনটা দাঁত দিয়ে কামড়ানোর একটা অদ্ভুত অভ্যাস তোমার ছিল।

এই সামান্য কাঠের টুকরোটা ছাড়া আমার কাছে তোমার আর কোনো পার্থিব চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। কোনো চিঠি নেই, কোনো দামি উপহার নেই, কোনো ফটোগ্রাফ নেই। কিন্তু এই সামান্য আধভাঙা পেন্সিলটার দিকে তাকালে আমার মনে হয়, মহাবিশ্বের সমস্ত দামি হীরে-জহরত মিলেও এর চেয়ে বেশি মূল্যবান কিছু হতে পারে না। এর প্রতিটি খাঁজে তোমার আঙুলের ঘাম আর তোমার চিন্তাশীল দাঁতের স্পর্শ আজও যেন স্পন্দিত হচ্ছে।

মানুষ স্মৃতির বিশাল বিশাল সৌধ বানাতে চায়। তারা তাজমহল বানায়, মার্বেল পাথরের ফলক বসায়। কিন্তু প্রেমের সবচেয়ে খাঁটি রূপ ফুটে ওঠে এই ধরনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, অবহেলিত চিহ্নের ভেতর দিয়ে। একটি পেন্সিল কত সাধারণ জিনিস, যে কেউ দেখলে তাকে আবর্জনা মনে করে ডাস্টবিনে ফেলে দেবে। অথচ এই পেন্সিলটার গ্রাফাইটের শিষের ভেতর দিয়ে একদিন কত কবিতা, কত অঙ্কের হিসেব আর কত না-বলা ভাবনা কাগজের বুকে রূপ নিয়েছিল।

আমি পেন্সিলটা হাতে তুলে নিই। আঙুল বোলাই সেই দাঁতের খাঁজগুলোর ওপর। মনে হয় আমি তোমার হাতটাই আবার ছুঁয়ে ফেললাম। স্পর্শের এই অলৌকিক শক্তি যে কোনো জড়বস্তুকেও জীবন্ত করে তুলতে পারে। ঈশ্বর হয়তো এই ক্ষুদ্র চিহ্নের মাধ্যমেই আমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন যে প্রেম কোনো বিরাট আড়ম্বরে থাকে না, সে লুকিয়ে থাকে জীবনের সবচেয়ে তুচ্ছ আর অবহেলিত মুহূর্তগুলোর গভীরে।

আধভাঙা এক কাঠের পেন্সিল পড়েছিল ড্রয়ারের নিভৃত কোণে,
যার প্রতিটি খাঁজে লেখা আছে কত স্মৃতি আমার ব্যথিত মনে।
দাঁতের কামড়ে ক্ষয়ে যাওয়া ওই ছোট্ট রাবারের দাগখানি,
আজও বয়ে নিয়ে চলেছে তোমার ফেলে যাওয়া এক অমর কাহিনী।

তাজমহল বানাতে পারিনি আমি কোনো মার্বেল পাথরের গায়,
এই সামান্য পেন্সিলটাই আমার একমাত্র শ্রেষ্ঠ পবিত্র উপায়।
কত কবিতা লিখেছিলে তুমি হয়তো এই সীসার অগ্রভাগ দিয়ে,
আজ আমি চেয়ে আছি তার দিকে আমার সমগ্র আরতি নিয়ে।

রাজা-বাদশাহের ধনভাণ্ডার তুচ্ছ এই একটি কাঠের তলে,
যা এক নিমিষে ভাসিয়ে দেয় আমার চোখ দুটো গভীর জলে।
এই তো আমার অক্ষয় সম্পদ, এই তো আমার চিরন্তন স্মৃতি,
যার কাছে পরাভূত হয়ে গেছে মহাকালের সমস্ত ইতি।

আমি পেন্সিলটা আবার খুব সাবধানে ড্রয়ারের ভেতর রেখে দিই। ওটা ওখানেই থাকবে। যতদিন এই ঘর থাকবে, যতদিন আমি থাকব, এই সবুজ কাঠের টুকরোটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গোপন রহস্য হয়ে থাকবে।

মানুষ অমরত্ব খোঁজে পাথরে আর বইয়ের পাতায়। কিন্তু আমি অমরত্ব খুঁজে পেয়েছি এই সামান্য কাঠের পেন্সিলের খাঁজে। তোমার ফেলে যাওয়া এই একটি চিহ্নই আমার কাছে প্রমাণ করে যে তুমি কোনো স্বপ্ন ছিলে না, তুমি ছিলে এক রক্তমাংসের সত্য, যে একদিন আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে এসে অনন্তের স্বাক্ষর রেখে গিয়েছিল। সেই স্বাক্ষরকে বুকে নিয়ে আমি আমার শেষ অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাই।