অধ্যায় ১০চায়ের ঠান্ডা কাপ ও কিছু পোড়া ম্যাচের কাঠি
একটি বিকেলের সমস্ত অবসান ও স্তব্ধতা
টিএসসি মোড়ের সেই পুরোনো চায়ের দোকানটায় বিকেলের দিকে ছাত্রদের যে ভিড়টা হতো, সন্ধে নামার সাথে সাথেই তা পাতলা হয়ে যেত। লাল প্লাস্টিকের একটা নড়বড়ে টুলে বসে আমি চায়ের কাপটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কাপের কানাটা একটু ভাঙা ছিল, আর তাতে জমে ছিল আধঠান্ডা হয়ে যাওয়া দুধ-চায়ের একটা পাতলা সর। কাচের অ্যাশট্রেটাতে উপচে পড়ছিল ফিল্টার ছেঁড়া সিগারেটের টুকরো আর কতগুলো পোড়া ম্যাচের কাঠি।
সেই বিকেলে তুমি শেষবারের মতো এসে বসেছিলে আমার উল্টোদিকের টুলটায়। তোমার চোখে ছিল তাড়া, বারবার হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলে। তুমি এসেছিলে কোনো কথা বলতে নয়, তুমি এসেছিলে বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতাটুকু শেষ করতে। মানুষ যখন সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলতে চায়, তখন সে চায় যত দ্রুত সম্ভব দৃশ্যপট থেকে সরে যেতে, যেন কোনো অপরাধী অপরাধের স্থান ছেড়ে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে।
তুমি বলেছিলে, আমাদের বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। বাস্তবতা! এই একটিমাত্র শব্দ দিয়ে মানুষ নিজের সমস্ত বিশ্বাসঘাতকতা, সমস্ত ভীরুতা আর আপসকামিতাকে কেমন সুন্দর এক ফুলের চাদরে ঢেকে দেয়। আমি তোমার মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম, তোমার সেই ঠোঁটের নড়াচড়ার দিকে তাকিয়েছিলাম যা একদিন আমাকে অনন্ত ভালোবাসার শপথ শুনিয়েছিল। অথচ আজ সেই একই ঠোঁট কত অনায়াসে উচ্চারণ করছে বাস্তবতার কথা।
আমি কোনো তর্ক করিনি। আমি একটিবারও বলিনি যে বাস্তবতা তো আমরাই তৈরি করি। আমি শুধু চায়ের কাপের দিকে তাকিয়েছিলাম। চা ঠান্ডা হয়ে জমে যাচ্ছিল, ঠিক যেমন করে আমার ভেতরের সমস্ত আবেগগুলো একে একে বরফ হয়ে মরে যাচ্ছিল। তুমি টেবিলের ওপর একটা হালকা চাপ দিয়ে উঠে দাঁড়ালে। বললে, ভালো থেকো। তারপর তোমার হাইহিলের খটখট শব্দ ভিড়ের শব্দের সাথে মিশে গেল।
ঠান্ডা হয়ে জমে গেল মাটির কাপে রাখা সেই চা,
তুমি চলে গেলে দূরে, বাড়িয়ে দিয়ে অসীম এই তৃষ্ণা।
অ্যাশট্রেতে পড়ে রইল পোড়া কত ম্যাচের কাঠি,
যার আগুনে ছাই হলো আমার এই অন্তরের খাঁটি মাটি।বাস্তবতার দোহাই দিয়ে কত সহজে মানুষ ফেলে যায়,
এক নিমিষে চূর্ণ করে সমস্ত বিশ্বাস এক ঝড়ের হাওয়ায়।
আমি কোনো কথা বলিনি, শুধু চেয়েছিলাম তোমার চোখের দিকে,
যেখানে নিভে গিয়েছিল ভালোবাসার সমস্ত আলো ফিকে।প্রথম পর্ব শেষ হলো এক নিঃশব্দ বিচ্ছেদের ঘায়ে,
রক্ত ঝরে পড়ল আমার সমস্ত রক্তাক্ত শরীরে আর পায়ে।
তবু কোনো অভিশাপ দেব না আমি তোমার চলার পথে,
তুমি সুখে থেকো তোমার সেই অহংকারী বাস্তবতার রথে।
তুমি চলে যাওয়ার পর আমি আরও আধা ঘণ্টা সেই টুলটায় বসেছিলাম। দোকানদার ছেলেটা এসে বলল, মামা, আরেক কাপ গরম চা দেব? আমি মাথা নেড়ে না বললাম। আমি সেই পোড়া ম্যাচের কাঠিগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা তুলে নিলাম। কাঠের শরীরটা কয়লা হয়ে গেছে, কিন্তু অগ্রভাগে তখনও হালকা পোড়া গন্ধ লেগে আছে। ভালোবাসা ঠিক এমনই, সে জ্বলে ওঠে এক মুহূর্তের জন্য, আর তারপর অনন্তকালের জন্য রেখে যায় কেবল পোড়া ছাই আর গন্ধ।
পর্ব এক এখানেই শেষ হলো। আমার রক্তমাংসের সমস্ত অহংকার চূর্ণ হয়ে গেল এই চায়ের দোকানে। কিন্তু আমি জানতাম, এই শেষ আসলে কোনো শেষ নয়, এটি কেবল এক দীর্ঘতর অন্ধকারের সূচনা। যে ক্ষত আজ তৈরি হলো, তা আগামী বহু বছর ধরে আমার আত্মার গভীরে পুঁজ তৈরি করবে। আমি পকেট থেকে টাকা বের করে টুলের ওপর রেখে উঠে দাঁড়াই। বাইরে তখন শহরের বুকে ঘন কালো রাত নেমে এসেছে, আর আমি সেই রাতের ভেতর নিঃশব্দে পা বাড়াই।