অধ্যায় ৪০উপসংহার: তোমার দিকে চেয়ে ঈশ্বরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম
যে ভালোবাসার কোনো বিনাশ নেই, যার কোনো শেষ নেই
অবশেষে আমরা এসে পৌঁছালাম এই দীর্ঘ যাত্রার শেষ সীমানায়। চল্লিশটি অধ্যায় জুড়ে যে রক্তক্ষরণ, যে হাহাকার আর যে রূপান্তরের কথা আমি লিখেছি, তা কোনো কাল্পনিক সাহিত্যের গল্প ছিল না। তা ছিল একজন রক্তমাংসের মানুষের নিজের অহংকার চূর্ণ করে প্রেমের চরম সত্যে উপনীত হওয়ার এক জীবন্ত দলিল।
আমি শুরু করেছিলাম এক পাহাড় সমান ক্ষোভ আর ঈশ্বরের প্রতি তীব্র নালিশ নিয়ে। ভাবতাম এই মহাবিশ্ব বড় নিষ্ঠুর, স্রষ্টা বড় অবিচারী, যিনি মানুষকে ভালোবাসার ক্ষমতা দেন অথচ সেই ভালোবাসাকে পাওয়ার অধিকার দেন না। আমি স্টোয়িক দর্শনের বর্ম পরে নিজেকে পাথর বানিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মানুষের কোনো দর্শনই যে ভালোবাসার সহজ সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, তা এই চল্লিশটি অধ্যায়ের প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে আজ প্রমাণিত হয়েছে।
আজ যখন আমি পেছন ফিরে তাকাই, তখন আমার চোখের সামনে কেবল তোমার সেই প্রথম দেখার নিষ্পাপ মুখটি ভেসে ওঠে। সেই এক পলকের দেখা, সেই এক টুকরো অমলিন হাসি, তার কাছে এই পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ, সমস্ত অপ্রাপ্তি আর সমস্ত বিচ্ছেদ কত তুচ্ছ, কত নগণ্য। ঈশ্বর যদি আমাকে এই এক জীবনে আর কিছুই না দিতেন, কেবল তোমাকে দূর থেকে এক পলক দেখার সৌভাগ্য দিতেন, তবুও সেই একটিমাত্র উপকারের বিনিময়ে তাঁর সমস্ত অনন্ত অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া যেত।
হ্যাঁ, আমি ঈশ্বরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। কোনো দুর্বলতা থেকে নয়, কোনো ভীরুতা থেকে নয়, এক পরম পূর্ণতার অহংকার থেকে। কারণ তিনি আমাকে এমন এক অমূল্য রত্ন চিনিয়েছিলেন, যার দীপ্তিতে গোটা মহাবিশ্বের সমস্ত অন্ধকার এক নিমেষে আলো হয়ে যায়। প্রেম যখন সমস্ত প্রত্যাশার ঊর্ধ্বে উঠে যায়, তখন মানুষ স্বয়ং ঈশ্বরের চেয়েও মহৎ হয়ে ওঠে। কারণ ঈশ্বর পুজো চান, শর্ত দেন, কিন্তু একনিষ্ঠ প্রেমিক কোনো শর্ত ছাড়াই নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়।
শেষ হলো এই দীর্ঘ কাব্য, শেষ হলো সমস্ত হাহাকারের গান,
তোমার চরণে সমর্পণ করে দিয়েছি আমার সমগ্র দেহ ও প্রাণ।
কোনো নালিশ নেই আজ আর সেই অদৃশ্য বিধাতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে,
আমি সমস্ত ক্ষোভ আর তিক্ততাকে ফেলে এসেছি অনেক পেছনে মাড়িয়ে।তোমার দিকে চেয়ে ঈশ্বরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম আমি সেই দিন,
যেদিন বুঝেছিলাম ভালোবাসা কোনোদিন হতে পারে না নিঃস্ব বা ঋণ।
এক পলকের দেখাতেই পেয়ে গেছি আমি কোটি জন্মের অমূল্য সুধা,
ঘুচে গেছে আমার সমস্ত অন্তরের আজন্মের তৃষ্ণা ও ক্ষুধা।যে ভালোবাসার কোনো বিনাশ নেই, যার নেই কোনো পার্থিব শেষ,
আমি রেখে গেলাম সেই অবিনশ্বর প্রেমের পবিত্র এক অবশেষ।
যদি কোনোদিন হারিয়ে যাই আমি এই নশ্বর পৃথিবীর মাটির তলে,
জেনে নিও আমি বেঁচে আছি চিরকাল তোমার ওই চোখের জলে।ঈশ্বরের সমস্ত স্বর্গের চেয়ে সুন্দর ছিল তোমার ওই শান্ত মুখখানি,
যার দিকে চেয়ে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম আমি মহাকালের সমস্ত কান্নার পানি।
ভালোবাসা অমর হয়ে থাক এই শহরের প্রতিটি অলিতে আর গলিতে,
যেখানে একজন পরাজিত প্রেমিক আজও বেঁচে আছে তোমারই আলোতে।
আমি আমার কলমটি টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখি। পেন্সিলের সেই পুরোনো দাগটির পাশে কলমটি এখন শান্তভাবে শুয়ে আছে। জানলার বাইরে দিয়ে সকালের প্রথম সোনালী রোদ এসে পড়েছে আমার লেখার খাতার ওপর। শহরের বুকে আবার নতুন দিনের কোলাহল শুরু হচ্ছে। বাসগুলো ছুটছে, রিকশার ঘণ্টি বাজছে, ফেরিওয়ালারা হাঁক ডাকছে।
জীবন বহমান, কিন্তু আমার ভেতরের ঝড় চিরদিনের মতো শান্ত হয়ে গেছে। এই বই যারা পড়বেন, যদি তাদের বুকে সামান্যতম কোনো ক্ষত জেগে ওঠে, তবে জানবেন ভালোবাসা কখনো কাউকে নিঃস্ব করে না। সে কেবল মানুষের ভেতরের ঈশ্বরকে জাগিয়ে তোলার জন্য আঘাত হানে। আমি আমার ঈশ্বরকে পেয়ে গেছি তোমার মুখের ছায়ায়। আর কোনো বাক্য নেই, আর কোনো সংলাপের প্রয়োজন নেই। এখন কেবল এক অনন্ত, অপার্থিব নিস্তব্ধতা। ভালো থেকো। চিরকাল ভালো থেকো।