পর্ব ৪: ক্ষমা ও অনন্ত সমর্পণ

অধ্যায় ৩৪দূরত্বের নীল সমুদ্র ও একটি নৌকা

যে পারাপারের কোনো প্রয়োজন ফুরায় না

৫ মিনিট পাঠ

আমাদের মাঝখানে যে দূরত্ব, সে কোনো কয়েক মাইলের রাস্তা নয়। সে এক সুবিশাল, অতল নীল সমুদ্র। সেই সমুদ্রের ওপারে তোমার তটরেখা, যেখানে সবুজ পাম গাছ দোলে আর শান্ত ঘরবাড়িগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। আর এপারে আমি একলা দাঁড়িয়ে আছি বালুকাচরের ওপর, যেখানে কেবল রুক্ষ বাতাস আর নোনা জলের আছড়ে পড়া ফেনা।

এই সমুদ্র পার হওয়ার মতো কোনো আধুনিক জাহাজ নেই, কোনো স্টিমার নেই। মাঝখানে শুধু ভেসে রয়েছে স্মৃতির এক ছোট্ট কাঠের ডিঙি নৌকা। সেই নৌকায় কোনো দাঁড় নেই, কোনো পাল নেই। সে কেবল ঢেউয়ের দোলায় দুলে দুলে এক অদ্ভুত ছন্দে ভেসে থাকে। আমি বহু বছর ধরে সেই নৌকাটার দিকে তাকিয়ে আছি। একসময় খুব ইচ্ছে করত ওই নৌকায় চেপে সব বিপদ তুচ্ছ করে তোমার তীরের দিকে পাড়ি দিই।

কিন্তু আজ আমি বুঝতে পেরেছি, এই পারাপারের আসলে কোনো প্রয়োজন নেই। সব দূরত্ব যদি মিটেই যায়, তবে তো সমুদ্রের অস্তিত্বই লোপ পাবে। বিরহ হলো সেই নীল জল, যা ভালোবাসার দুটি তীরকে অনন্তকাল ধরে এক অদ্ভুত মায়াজালে বেঁধে রাখে। যদি আমরা এক হয়ে যেতাম, তবে হয়তো সংসারের প্রতিদিনের ঘর্ষণে আমাদের সেই স্বপ্নময় রূপটি মলিন হয়ে যেত। কিন্তু এই দূরত্বের কারণেই তুমি আজও আমার কাছে স্বর্গের অপ্সরী, আর আমি তোমার কাছে এক অবিনাশী স্মৃতি।

দূরত্ব মানুষকে পবিত্র করে। সে সমস্ত শরীরী ক্লেদ ধুয়ে ফেলে আত্মাকে এক জ্যোতির্ময় বিন্দুতে পরিণত করে। আমি এই নীল সমুদ্রকে ভালোবেসে ফেলেছি। এর নোনা জল আমার চোখে লাগলে আমি তাকে অশ্রু মনে করি না, আমি মনে করি এ আমার তপস্যার তীর্থোদক। নৌকাটি ভাসছে, ভাসুক অনন্তকাল। তার আর কোনো কূলে ভেড়ার তাড়া নেই।

আমাদের মাঝে বয়ে চলেছে এক সুবিশাল নীল সিন্ধু,
যার ওপারে তুমি আছো জ্বলে এক অলৌকিক স্নিগ্ধ বিন্দু।
এপারে আমি একা দাঁড়িয়ে দেখি ঢেউয়ের অবিরাম ভাঙন,
যেখানে সঁপে দিয়েছি আমার সমস্ত আজন্মের গোপন রাঙন।

কাঠের নৌকা দুলছে একা সেই অতল জলের বুকে,
কোনো কূলে যাওয়ার তাড়া নেই তার, সে ভাসছে পরম সুখে।
মিলন হলে হয়তো ফুরিয়ে যেত ভালোবাসার এই অনন্ত রূপ,
বিরহের জাদুতে তাই এই মহাবিশ্ব হয়ে আছে নিশ্চুপ।

পারাপারের আর কোনো প্রয়োজন নেই এই মায়াবী রাতে,
আমি হাত রেখেছি স্মৃতির ওই অদৃশ্য নৌকার পাতে।
দূরত্বই তো বাঁচিয়ে রাখল প্রেমের এই পরম সুবাসখানি,
যার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল পৃথিবীর সমস্ত কান্নার পানি।

আমি সমুদ্রের তীরের ভিজে বালুর ওপর বসে পড়ি। জোয়ারের জল এসে আমার পায়ের পাতা ছুঁয়ে দিয়ে যায়। সেই স্পর্শে কোনো বরফের ঠান্ডা নেই, আছে এক পরম আত্মীয়তার ওম। যেন বহু দূর দেশ থেকে তোমার পাঠানো কোনো বার্তা এই ঢেউয়ের মাধ্যমে আমার কাছে এসে পৌঁছাল।

পারাপার ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু ভালোবাসা ফুরায়নি। সে সাগরের মতোই অতল, আকাশের মতোই অসীম। আমি এই তীরে বসেই আমার বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারি। যে মানুষের বুকের ভেতর এমন এক সমুদ্র আছে, তার আর অন্য কোনো নদীর সন্ধানে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি সেই সাগরের গভীরেই নিজের সমস্ত অস্তিত্ব বিলীন করে দিই।