পর্ব ১: রক্তমাংসের পরাজয় ও গোপন ক্ষত

অধ্যায় ০৮মধ্যরাতের ফুটপাথ ও একজোড়া ভারী জুতো

শহরের নিস্তব্ধতায় কেবল নিজের ছায়াকে বহন করা

৫ মিনিট পাঠ

যখন ঘরের চার দেওয়াল দমবন্ধ করা কারাগারের মতো মনে হয়, তখন একমাত্র আশ্রয় হয়ে ওঠে মধ্যরাতের ফুটপাথ। আমার একজোড়া পুরোনো চামড়ার ভারী বুট জুতো ছিল, যার তলাটা ঘষে ঘষে মসৃণ হয়ে গিয়েছিল। সেই জুতো পায়ে দিয়ে আমি যখন নির্জন রাস্তায় হাঁটতাম, তখন পিচের ওপর ঠকঠক করে যে শব্দ হতো, তা শুনলে মনে হতো কোনো নিঃসঙ্গ সৈনিক নিজের পরাজয়ের খবর নিয়ে একা ফিরে চলেছে।

রাত আড়াইটায় শাহবাগ থেকে টিএসসি হয়ে নীলক্ষেতের দিকে যাওয়ার রাস্তাটা তখন পুরোপুরি ফাঁকা। রাস্তার দুই পাশের প্রাচীন রেইনট্রি গাছগুলো অন্ধকারের ভেতর কেমন প্রকাণ্ড ভূতের মতো হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। সোডিয়ামের ঘোলাটে হলুদ আলোয় আমার সামনে একটা লম্বা কালো ছায়া পড়ত। আমি হাঁটতাম, আর ছায়াটা আমার সাথে সাথে এগোত। কখনো কখনো মনে হতো, এই পুরো পৃথিবীতে আমার আর কোনো সহচর নেই, কেবল এই বোবা ছায়াটাই আমার সমস্ত পাপ আর যন্ত্রণার একমাত্র সাক্ষী।

ফুটপাথের কিনারায় তখন ছিন্নমূল মানুষগুলো পুরোনো চটের বস্তা বা পলিথিন মুড়ি দিয়ে কুকুরের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকত। তাদের সেই নিশ্চিন্ত ঘুম দেখলে আমার হিংসে হতো। তাদের পেটে ভাত নেই, গায়ে শীতের গরম কাপড় নেই, অথচ তাদের চোখে ঘুম আছে। আর আমার মাথায় ছাদ আছে, ব্যাংকে টাকা আছে, তবু আমার চোখের পাতায় এক ফোঁটাও ঘুম নেই। কেন নেই? কারণ তাদের বুকের ভেতর এমন কোনো নাম খোদাই করা নেই, যা প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে সাথে রক্তক্ষরণ ঘটায়।

স্মৃতি হলো সবচেয়ে বড় অভিশাপ। স্মৃতি মানুষকে ঘুমাতে দেয় না। সে মধ্যরাতে কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, মনে পড়ে সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলের কথা? মনে পড়ে সেই রিকশার হুড ফেলে দিয়ে এক চাদরে দুজন ভিজে যাওয়ার স্মৃতি? আমি মাথা ঝাঁকিয়ে সেই কণ্ঠটাকে তাড়িয়ে দিতে চাইতাম, আর আমার পায়ের গতি বাড়িয়ে দিতাম। কিন্তু জুতো যত জোরেই ফেলতাম, মনের ভেতরের শব্দটা তার চেয়েও দ্বিগুণ জোরে বেজে উঠত।

ভারী জুতোর শব্দ ওঠে নির্জন ফুটপাথের বুকে,
এই শহরের কোনো মানুষই বাঁচেনি পুরোপুরি সুখে।
হলুদ আলোর নিচে দীর্ঘ হয়ে নামে আমার একলা ছায়া,
চারপাশের নিস্তব্ধতায় জমে ওঠে কেবল তোমার মায়া।

কত মাইল হাঁটলে তবে স্মৃতিগুলো পেছনে ফেলে আসা যায়?
কত রাত জাগলে তবে এই অশান্ত মন মুক্তি পায়?
গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে বোবা প্রহরীর মতো পথ জুড়ে,
আর আমার বুকের গানটা কেঁদে মরে অচেনা কোনো সুরে।

ঘুম নেই এই চোখে, নেই কোনো আশ্রয়ের শান্ত ঠিকানা,
ভবঘুরে এই হৃদয়ের পথচলায় কোনো নিষেধ মানা না।
জুতো ক্ষয়ে যায় পিচের ঘর্ষণে রাতের পর রাত ধরে,
শুধু তোমার স্মৃতিটুকু বুকের ভেতর আজও অক্ষত আলো করে।

হাঁটতে হাঁটতে একসময় কার্জন হলের সামনে গিয়ে থামতাম। ব্রিটিশ আমলের সেই লাল ইটের খিলানগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে মনে হতো, কত শতাব্দী পার হয়ে গেল, কত রাজা-রানি এলো আর গেল, কত সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে গেল, কিন্তু মানুষের বুকের ভেতরের এই আদিম বিরহ একটুও বদলালো না। হাজার বছর আগের কোনো প্রেমিকও হয়তো এমন কোনো এক নিস্তব্ধ রাতে একা একা হেঁটেছিল, আর নিজের দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ভাসিয়ে দিয়েছিল।

ভোর হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে বাতাসটা অসম্ভব ঠান্ডা হয়ে আসে। দূর থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, আর শহরের প্রথম আবর্জনা পরিষ্কারের গাড়িটা ঘড়ঘড় শব্দে রাস্তা দিয়ে চলতে শুরু করে। আমি ক্লান্ত শরীরে বাসার পথ ধরি। জানি, এই হাঁটায় কোনো সমাধান মিলবে না, এই পথচলা কোনোদিন ফুরাবে না। কিন্তু যতক্ষণ আমার পা দুটো চলবে, ততক্ষণ আমি এই শহরের রাজপথে তোমার স্মৃতির পদচিহ্ন এঁকে দিয়ে যাব।