অধ্যায় ৩০দর্শনের পরাজয় ও বোবা ট্রাফিক
জীবনের সমস্ত জটিল অঙ্ক যেখানে শূন্যে এসে দাঁড়ায়
মহাখালীর ফ্লাইওভারের নিচে বিকেল পাঁচটার সময় যে ট্রাফিক জ্যামটা তৈরি হয়, তার দিকে তাকালে জীবনের সমস্ত জটিল দর্শনের কঙ্কালটা বেরিয়ে আসে। শত শত বাস, প্রাইভেট কার আর সিএনজি একে অপরের গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কালো বিষাক্ত ধোঁয়া আকাশে উড়ছে, হর্নের তীব্র কানফাটানো চিৎকারে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়তে রাজি নয়, সবাই আগে যেতে চায়, সবাই এক উন্মাদ প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
আমি ফুটপাথের এক কোণে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমার ব্যাগের ভেতর তখনও হেগেলের দ্বন্দ্বমূলক দর্শনের একটা ভারী বই ছিল। কিন্তু সেই ট্রাফিকের নরককুণ্ডের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, মানুষের পুরো ইতিহাসটাই তো এই মহাখালীর ট্রাফিক জ্যামের মতো। কত দ্বন্দ্ব, কত সংঘাত, কত বিপ্লব আর রক্তপাত। অথচ দিনশেষে মানুষ কোথায় পৌঁছাতে পেরেছে? সেই একই স্থবিরতা, সেই একই নিঃসঙ্গতা আর সেই একই অন্ধকারের গোলকধাঁধায়।
সব দর্শনের চূড়ান্ত গন্তব্য আসলে এক বিশাল শূন্য। মানুষ যত জটিল অঙ্কই কষুক না কেন, জীবনের সমীকরণের শেষে ফলাফল একটাই আসে: শূন্য। আর এই শূন্যের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের কেবল একটিমাত্র আশ্রয় অবশিষ্ট থাকে, তা হলো ভালোবাসা। যদি জীবনে একবার কারো চোখে নিজেকে দেখার সৌভাগ্য না হয়, তবে এই পৃথিবীর সমস্ত প্রগতি, সমস্ত বিজ্ঞান আর সমস্ত দর্শন কেবল একদল অন্ধ মানুষের পথ হাতড়ে বেড়ানোর মতো হাস্যকর।
আমি বইটা ব্যাগ থেকে বের করে ফুটপাথের এক পুরোনো বইয়ের হকারের ডালায় মাত্র বিশ টাকায় বিক্রি করে দিলাম। হকার অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল, কারণ বইটার আসল দাম ছিল অনেক বেশি। আমি ম্লান হাসলাম। তাকে কীভাবে বোঝাব যে এই বইয়ের আর কোনো প্রয়োজন আমার নেই? আমার সমস্ত তত্ত্ব শেখা হয়ে গেছে। তোমার প্রেম আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে যে বুদ্ধির অহংকার দিয়ে কোনোদিন আত্মাকে তৃপ্ত করা যায় না।
বোবা ট্রাফিকের মাঝে দাঁড়িয়ে দেখলাম দর্শনের চূড়ান্ত পরাজয়,
মানুষের সমস্ত জ্ঞান কেবল এক করুণ অহংকারের অভিনয়।
হর্নের চিৎকারে হারিয়ে গেল শত শতাব্দীর প্রাচীন বাণী,
ধুলোমাখা পিচের ওপর পড়ে রইল আমার সমস্ত অহংকারখানি।কত অঙ্ক কষেছিলাম জীবনে, চেয়েছিলাম জয়ী হতে প্রতিটি রণে,
অথচ আজ সব হিসেব চুকিয়ে দাঁড়িয়েছি এই নিভৃত বনে।
হেগেল আর কান্ট ভেসে গেল ওই নর্দমার কালো জলের ধারায়,
শুধু তোমার স্মৃতিটুকু জেগে রইল আমার পরম মুক্তির তারায়।পর্ব তিন শেষ হলো দর্শনের সমস্ত অহংকার চূর্ণ করে দিয়ে,
এবার দাঁড়াব আমি ঈশ্বরের সামনে আমার এই নিঃস্ব হৃদয় নিয়ে।
কোনো তর্ক নেই আর, নেই কোনো জটিল সূত্রের জাল,
ভালোবাসাই আমার একমাত্র সত্য, ভালোবাসাই আমার মহাকাল।
আমি ট্রাফিকের ভিড় ঠেলে হাঁটা শুরু করলাম। আমার হাত দুটো এখন পুরোপুরি খালি, কাঁধের ব্যাগটা হালকা হয়ে গেছে। মানুষ যখন নিজের সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তিক বোঝা নামিয়ে ফেলে, তখন তার পা দুটো কেমন পাখির ডানার মতো হালকা হয়ে ওঠে।
পর্ব তিন এখানেই চুকিয়ে দিলাম। আমি আর কোনো তত্ত্বের আশ্রয় নেব না। আমি আর নিজেকে কোনো দার্শনিক ভাবব না। আগামী অধ্যায়গুলোতে আমি কেবল একজন ক্ষমার ভিখারি, একজন অনন্ত প্রেমিক যে নিজের সমস্ত দাবি ত্যাগ করে শান্ত নদীর মতো সাগরের দিকে বয়ে চলেছে। সেই সাগরের জলে অবগাহন করেই আমি আমার জীবনের পরম সার্থকতা খুঁজে নেব।