পর্ব ২: কুয়াশা, স্মৃতি ও অসমাপ্ত কথন

অধ্যায় ১৭অসময়ের ফোন কল ও স্তব্ধতা

যে কথাগুলো কোনোদিন বলা হয়ে ওঠেনি

৫ মিনিট পাঠ

রাত পৌনে চারটায় যখন ফোনের রিংটোনটা বেজে উঠেছিল, তখন সারা বাড়ি এক গভীর কবরের মতো নিস্তব্ধ ছিল। গভীর রাতে অচেনা কোনো নম্বর থেকে ফোন এলে মানুষের রক্তে এক অজানা আতঙ্কের স্রোত বয়ে যায়। মনে হয় কোনো দুর্ঘটনার খবর, কোনো মৃত্যুর সংবাদ। আমি ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসেছিলাম, অন্ধকারেই হাতড়ে ফোনটা তুলে নিয়েছিলাম।

স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আমার বুকের স্পন্দন কয়েক মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোনো অচেনা নম্বর নয়, কোনো দুর্ঘটনার সংবাদ নয়। সেই স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছিল সেই পুরোনো, মুখস্থ এগারোটা ডিজিট, যা আমি বহু বছর ধরে ডায়াল করার সাহস পাইনি। আমি কাঁপতে কাঁপতে সবুজ বোতামটা টেনে কানে চেপে ধরেছিলাম। হ্যালো বলার মতো শক্তি আমার ফুসফুসে ছিল না।

ওপারে কোনো কথা ছিল না। শুধু একটা মানুষের গভীর, ভারী নিঃশ্বাসের ওঠানামা শোনা যাচ্ছিল। যেন কেউ বহু দূর থেকে এক পাহাড় সমান দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ফোনের মাউথপিসে মুখ চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি শুনছিলাম সেই নিঃশ্বাসের শব্দ। সেই শব্দের প্রতিটি তরঙ্গে কত বছরের না-বলা অভিমান, কত রাতের জমাট কান্না আর কত না-পাওয়ার হাহাকার মিশে ছিল, তা কোনো ভাষা দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না।

আমরা কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করিনি। মিনিট দেড়েক ধরে কেবল দুই প্রান্তের দুই মেরুর স্তব্ধতা একে অপরকে স্পর্শ করছিল তারের অদৃশ্য তরঙ্গের ভেতর দিয়ে। মানুষ যখন পরম যন্ত্রণায় থাকে, তখন সে কোনো শব্দ খুঁজে পায় না। শব্দ তো কেবল বুদ্ধিজীবীদের বাহাদুরি, হৃদয়ের গভীরতম ক্ষতের কোনো ব্যাকরণ থাকে না। তারপর ওপার থেকে হঠাৎ করে সংযোগটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। টু-টু-টু শব্দে শূন্যতা আবার ঘরে ফিরে এলো।

মধ্যরাতে বেজে উঠল এক অচেনা সুরের রিংটোন,
ওপারে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমার পুরোনো সেই মন।
কোনো কথা হলো না, শুধু নিঃশ্বাসের ভারি আওয়াজ এল ভেসে,
আমরা দুজন ভেসে গেলাম এক চিরন্তন ব্যথিত দেশে।

কত শতাব্দী জমে ছিল সেই সামান্য এক মিনিটের নিস্তব্ধতায়,
সব অভিমান মরে গেল আত্মদহনের গোপন ব্যথায়।
একটি হ্যালো বলার সাহস ছিল না কারো এই পোড়া মুখে,
ভালোবেসে কোনো মানুষই কি বাঁচতে পারে পরম সুখে?।

লাইন কেটে গেল, ঘরে নেমে এলো আরও গাঢ় এক রাত,
আমি অন্ধকারের ভেতর বাড়িয়ে দিলাম আমার বোবা হাত।
যে কথা বলা হলো না তা-ই অমর হয়ে রইল এই ধরাতলে,
বোবা কান্নারা ভিড় করে এল আমার এই চোখের জলে।

আমি ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম। আমি জানি না তুমি কেন ফোন করেছিলে। হয়তো কোনো দুঃস্বপ্ন দেখে তোমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, হয়তো মদ খেয়ে মাতাল হয়ে তুমি অতীতের ভূত দেখতে পেয়েছিলে, হয়তো বা তোমার মনে হয়েছিল এই পৃথিবীর সব আলো নিভে যাওয়ার আগে অন্তত একবার আমার অস্তিত্বটুকু পরীক্ষা করে দেখা দরকার।

কারণ যাই হোক না কেন, সেই স্তব্ধতাই ছিল আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ কথোপকথন। আমরা যদি কথা বলতাম, তবে হয়তো আবার কোনো তিক্ততা হতো, আবার কোনো পুরোনো অভিযোগ উঠে আসত। কিন্তু সেই বোবা এক মিনিট আমাদের সমস্ত অভিযোগকে ধুয়েমুছে এক পবিত্র সমাধিতে পরিণত করে দিয়ে গেল। আমি ফোনটা নামিয়ে রাখলাম। জানি, আর কোনোদিন এই নম্বর থেকে কোনো কল আসবে না। কিন্তু সেই নিঃশ্বাসের শব্দটুকু আমার সারা জীবনের পাথেয় হয়ে রইল।