অধ্যায় ২৮পোড়া কাগজের ধোঁয়া ও অসম্পূর্ণ বাক্য
ভস্মের ভেতরেও যে অনুভূতিগুলো অমর থেকে যায়
মাঝে মাঝে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে নিজের ইতিহাসকে ধ্বংস করে ফেলতে চায়। সে মনে করে যা কিছু তাকে কষ্ট দেয়, তা পুড়িয়ে ছাই করে দিলেই শান্তি মিলবে। সেদিন সন্ধ্যায় আমিও তেমনই এক উন্মাদনায় পেয়ে বসেছিলাম। আমার ড্রয়ারে জমানো তোমার কতগুলো পুরোনো চিঠির খসড়া, ট্রেনের টিকিট আর একসাথে দেখা সিনেমার কাউন্টার ফয়েলগুলো একটা মাটির সানকিতে জড়ো করেছিলাম।
দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে আগুনটা যখন কাগজের কিনারায় ছুঁইয়ে দিলাম, তখন নীল আর হলুদ রঙের শিখা লকলক করে জ্বলে উঠল। শুকনো কাগজগুলো মুহূর্তে কুঁকড়ে কালো হয়ে যেতে লাগল। ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল পোড়া কাগজের সেই তীব্র, কটু গন্ধ। আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম সেই আগুনের দিকে। মনে হলো আমি আমার নিজের অতীতকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারছি।
একটা চিঠির কোণ তখনও পুরোপুরি পোড়েনি। আগুনের শিখাটা সেখানে পৌঁছানোর ঠিক আগের মুহূর্তে আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমার নিজের কাঁচা হাতের লেখায় লেখা একটি অসম্পূর্ণ বাক্য: তুমি যদি কোনোদিন…। এর পরের অংশটুকু আগুনের গ্রাসে ছাই হয়ে মিলিয়ে গেল। বাক্যটা কোনোদিন সম্পূর্ণ হয়নি, জীবনেও না, চিঠিতেও না।
আমি সানকির ছাইগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম। কাগজ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু সেই কাগজের গায়ে যে শব্দগুলো লেখা ছিল, তাদের কি কোনো বিনাশ হয়েছে? পদার্থবিজ্ঞানের শক্তির নিত্যতা সূত্র বলে, শক্তিকে ধ্বংস করা যায় না, কেবল রূপান্তর করা যায়। তেমনিভাবে প্রেমের প্রতিটি অনুভূতিরও কোনো ধ্বংস নেই। সে কাগজ থেকে মুক্ত হয়ে এখন ধোঁয়া হয়ে ঘরের বাতাসে মিশে গেছে, আর সেই বাতাসটাই তো আমি আমার ফুসফুসে টেনে নিচ্ছি। আপনি যা পোড়াতে চান, তা আরও নিবিড়ভাবে আপনার রক্তের ভেতর মিশে যায়।
আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিলাম আমার সমস্ত পুরোনো চিঠি,
ভেবেছিলাম ভস্মের ভেতর মিলবে এক চিরন্তন পরম ইতি।
নীল শিখা গ্রাস করল কত স্মৃতি আর ভালোবাসার খসড়া পাতা,
ধোঁয়ায় ঢেকে গেল ঘরের বাতাস আর আমার ব্যথিত মাথা।কিন্তু শব্দ কি কখনো পোড়ে? অনুভূতি কি কোনোদিন ছাই হয়?।
আগুন তো কেবল কাগুজে শরীরকে দেয় এক ক্ষণস্থায়ী ক্ষয়।
অসম্পূর্ণ যে বাক্যটি পুড়ে গেল চোখের পলকে নিমেষে,
সে যে রক্ত হয়ে আজও কথা বলে আমার অন্তিম দেশে।ছাইয়ের ওপরে হাত রাখি আমি, তখনও রয়েছে তার ওম,
প্রেমের এই অবিনাশী রূপ দেখে স্তব্ধ হয়ে যায় আমার রোম।
পোড়াতে গিয়েও তোমায় আমি আরও বেশি করে পেলাম ফিরে,
তুমি মিশে গেলে ধোঁয়া হয়ে আমার নিঃশ্বাসের তীরে তীরে।
আমি সানকিটা নিয়ে ব্যালকনিতে যাই। রাতের বাতাসে ছাইগুলো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিই। কালো কালো ছাইয়ের কণাগুলো বাতাসের ঘূর্ণিপাকে পাক খেতে খেতে অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে যায়। তারা হয়তো ঝরে পড়বে শহরের কোনো ফুটপাথে, কোনো গাছের পাতায় কিংবা কোনো অপরিচিত পথিকের কাঁধে।
ধ্বংস করার এই খেলা বৃথা। প্রেমকে হত্যা করার মতো কোনো অস্ত্র আজ পর্যন্ত এই মানবজাতি আবিষ্কার করতে পারেনি। আপনি তাকে যত মারতে চাইবেন, সে তত নতুন রূপে আপনার সামনে এসে দাঁড়াবে। আমি খালি সানকিটা ঘরে নিয়ে আসি। আগুনে পোড়ার পর আমার মনটা এখন আরও হালকা, আরও শান্ত। কারণ আমি জেনে গেছি, কোনো স্মৃতিচিহ্নের ওপর আমার ভালোবাসা আর নির্ভরশীল নয়। সে স্বয়ম্ভূ, সে অবিনশ্বর।