পর্ব ২: কুয়াশা, স্মৃতি ও অসমাপ্ত কথন

অধ্যায় ১১অন্য কোনো বারান্দায় তোমার ভিজে চুল

যে দৃশ্য দেখার অধিকার আমি অনেক আগেই হারিয়েছি

৫ মিনিট পাঠ

আষাঢ়ের এক মেঘলা দুপুরে শহরের একটা ব্যস্ত ওভারব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হলো, এই আকাশটা কি সবার জন্যই একরকম বৃষ্টি ঝরায়? যে মানুষটা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়ির কাচের ওপারে বসে ল্যাপটপে চোখ রাখছে, তার বৃষ্টি আর যে রিকশাচালক পলিথিনের টুকরো মাথায় দিয়ে ভিজে চুপচুপে হয়ে প্যাডেল টানছে, তার বৃষ্টি তো এক নয়। মানুষের ভেতরের অবস্থাই নির্ধারণ করে দেয় বৃষ্টির প্রকৃত রঙ আর তাপমাত্রা।

আমার মনে পড়ল বহু বছর আগের এক বৃষ্টির দিনের কথা। তুমি তখন অন্য এক পাড়ায়, এক পুরোনো লাল সুরকির দালানের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলে। স্নান সেরে এসে ভিজে চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে ঝাড়ছিলে, আর জলের সূক্ষ্ম কণাগুলো বাতাসে ধূলিকণার মতো ছড়িয়ে পড়ছিল। তোমার গায়ে ছিল একটা সাধারণ নীল সুতির শাড়ি, আর তোমার মুখে ছিল এক অনাবিল স্বস্তি, যা কোনো প্রসাধন দিয়ে কেনা যায় না। আমি নিচের গলির মোড়ে একটা রিকশার হুডের নিচে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যটা চুরি করে দেখেছিলাম।

আজ হয়তো তুমি অন্য কোনো বাড়ির বারান্দায় দাঁড়াও। হয়তো সেই বারান্দার গ্রিলে দামি অপরাজিতা বা বাগানবিলাসের লতা জড়িয়ে থাকে, হয়তো সেখানে কোনো সৌখিন আরামকেদারা পাতা আছে। সেখানেও বৃষ্টি নামে, সেখানেও তুমি হয়তো স্নান সেরে চুল শুকোতে আসো। কিন্তু সেই দৃশ্য দেখার অধিকার আমার কোনোদিন ছিল না, আজও নেই। ভালোবাসা মানুষকে কোনো মালিকানা দেয় না, সে কেবল দেয় দূর থেকে এক পলক দেখার পর আজীবন তৃষ্ণার্ত থাকার অভিশাপ।

অধিকার হারানোর চেয়ে যন্ত্রণাদায়ক আর কিছু হতে পারে না। যখন আপনি জানেন যে একটি মানুষের প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি হাসির ভঙ্গি আপনার চেয়ে বেশি কেউ চেনে না, অথচ বাস্তব জগতে সেই মানুষটির নাম উচ্চারণ করার সামান্যতম আইনি বা সামাজিক অনুমতিটুকুও আপনার নেই। এই অনধিকারের প্রাচীরটাই তো মানুষকে কবি বানিয়ে দেয়, কিংবা তাকে জীবন্ত এক পাথরে রূপান্তর করে।

অন্য কোনো বারান্দায় আজ উড়ছে তোমার চুল,
আমি কেবল ঝরা পাতার মতো ভাঙছি কত ভুল।
বৃষ্টির জল ছুঁয়ে যায় তোমার তনুর স্নিগ্ধ রেখা,
অথচ আমার ভাগ্যে কেবল জমাট আঁধার লেখা।

কোনো অধিকার ছিল না আমার তোমার অঙ্গ ছোঁয়ার,
আমি তো চেয়েছি শুধু একলা দাঁড়িয়ে এই বিরহ বোওয়ার।
মেঘের ডাক ভেসে আসে দূর আকাশের সীমানা থেকে,
যে আকাশ তোমায় প্রতিদিন পরম স্নেহে রাখে ঢেকে।

সুখে থেকো তুমি তোমার ওই সাজানো নিভৃত নীড়ে,
আমি চিরকাল হারিয়ে যাব এই অচেনা শহরের ভিড়ে।
এক ফোঁটা জল যদি কভু পড়ে তোমার চোখের কোণে,
জেনো সে আমার অশ্রু হয়ে নেমেছে তোমার মনে।

আমি ওভারব্রিজের রেলিং থেকে হাত সরিয়ে নিই। বৃষ্টির জল আমার শার্টের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে নেমে পিঠটাকে ঠান্ডা করে দিচ্ছে। মানুষ কেন স্মৃতিকে এত ভয় পায়? কারণ স্মৃতি এমন এক আয়না, যা বর্তমানের সমস্ত মিথ্যাকে নগ্ন করে দেয়। আপনি যত বড় চাকরি করুন, যত দামী গাড়ি চড়ুন না কেন, স্মৃতির আয়নার সামনে দাঁড়ালে আপনি কেবল সেই নিঃস্ব মানুষটাই হয়ে যান, যে একদিন কারো একটু হাসির জন্য বৃষ্টির মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত।

আমি হাঁটা শুরু করি। বৃষ্টি আরও জোরে নামে, চারপাশের ট্রাফিকের হর্নগুলো বৃষ্টির গর্জন আর চাকার শব্দে ঢাকা পড়ে যায়। আমি মনে মনে বলি, তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থেকো। যে দৃশ্য আমার দেখার কথা ছিল না, তা আমি এক পলকের জন্য হলেও দেখতে পেয়েছিলাম, এই তো আমার চরম সৌভাগ্য। বাকি জীবন এই একটি মাত্র স্মৃতির সুবাস নিয়েই তো নিঃশব্দে কাটিয়ে দেওয়া যায়।