প্রারম্ভিকা

প্রস্তাবনা: ভাষার ওপারে যে কুয়াশা

শব্দের সীমানা যেখানে শেষ, অনুভূতির সেখানে শুরু

৪ মিনিট পাঠ

কথা গিলতে গিলতে মানুষের গলার ভেতর একসময় একটা শক্ত মাংসপিণ্ড তৈরি হয়। চিকিৎসকের স্টেথোস্কোপ বা এক্স-রে মেশিনে সেই দলা পাকানো মাংসপিণ্ডের কোনো অস্তিত্ব ধরা পড়ে না, কিন্তু ঢোক গিলতে গেলে সারাক্ষণ সেখানে একটা চিনচিনে ব্যথা জানান দেয়। আমরা যাকে নীরবতা বলে ভুল করি, তা আসলে ওই গিলে ফেলা হাজার হাজার শব্দের সমাধিক্ষেত্র।

মানুষের তৈরি অভিধানগুলো বড় দরিদ্র। সেখানে বাজারের ফর্দ লেখার জন্য পর্যাপ্ত শব্দ আছে, অফিসের মিটিংয়ে তর্ক করার জন্য চমৎকার সব বাক্য আছে, কিন্তু মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে বুকের বাঁ পাশটা কেন হু হু করে ফাঁকা হয়ে যায়, তা বোঝানোর মতো একটি শব্দও নেই। আমরা যখন কাউকে নিজের কষ্টের কথা বলতে যাই, তখন শব্দের এই দীনতা আমাদের বড় অসহায় করে তোলে। মনের ভেতর যা ছিল এক বিশাল সমুদ্রের তোলপাড়, মুখ দিয়ে বের হওয়ার পর তা হয়ে দাঁড়ায় এক গ্লাস ঘোলা জলের মতো। শ্রোতা সেই ঘোলা জলটুকু দেখেই আমাদের বিচার করে বসে। তাই একসময় সংবেদনশীল মানুষ আর কথা বাড়ায় না। সে চুপ করে যায়।

এই চুপ করে যাওয়াটা কোনো অভিমান নয়, এ এক গভীর আত্মরক্ষা। হেমন্তের শেষ বিকেলে ধানক্ষেতের ওপর যেভাবে নিঃশব্দে কুয়াশা নামে, না-বলা কথাগুলোও ঠিক সেভাবে মানুষের চারপাশে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় মানুষটা দিব্যি হাসছে, রিকশাওয়ালার সাথে ভাড়া নিয়ে দরদাম করছে, চায়ের কাপে ফুঁ দিচ্ছে। অথচ তার ভেতরের মানুষটা তখন ওই কুয়াশার দেয়ালের ওপারে একা বসে নিজের ক্ষতের হিসাব মেলাচ্ছে। সেখানে কারো প্রবেশাধিকার নেই।

আমরা সারাজীবন মানুষের উচ্চারিত কথাগুলোর পেছনেই ছুটে মরলাম। কে কী বলল, কে কোন কথা রাখল না, তাই নিয়ে আমাদের যত অনুযোগ। কিন্তু মানুষ যা কোনোদিন উচ্চারণই করতে পারল না, তার ওজন কি উচ্চারিত শব্দের চেয়ে অনেক বেশি নয়? যে কথাগুলো কোনোদিন কাউকে মুখ ফুটে বলা যায়নি, অথচ মনের এক কোণে আজীবন থেকে গেছে, সেই বোবা অনুভূতিগুলোরই নিভৃত মানচিত্র এই বই। শব্দের সীমানা যেখানে এসে ব্যর্থ হয়ে থেমে গেছে, আমাদের যাত্রা ঠিক সেই কুয়াশাচ্ছন্ন প্রান্তর থেকে শুরু।