অধ্যায় ২১ক্লান্তি যখন অভ্যাসে রূপ নেয়
কোনো বড় শোক নেই, তবু সকালে ঘুম ভাঙলে বেঁচে থাকাকে বোঝা মনে হওয়া
টানা দশ ঘণ্টা ঘুমানোর পরও যখন সকালে চোখ খুলে মনে হয় শরীরের প্রতিটি হাড় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে আছে, তখন বুঝতে হবে এই ক্লান্তি শরীরের নয়, এই ক্লান্তি আত্মার। জীবনে কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি, কেউ মারা যায়নি, চাকরিটাও ঠিকঠাক আছে, তবু কেন যেন বিছানা ছেড়ে মেঝেতে পা রাখতে গেলেই বুকটা ভারী হয়ে আসে। বেঁচে থাকাটাকে তখন কোনো উৎসব নয়, বরং এক দীর্ঘ ও একঘেয়ে শাস্তির মতো মনে হয়।
যৌবনের শুরুতে মানুষের দুঃখগুলো থাকে খুব তীব্র ও ধারালো। তখন আঘাত পেলে মানুষ চিৎকার করে কাঁদে, জিনিসপত্র ভাঙে। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই তীব্র দুঃখগুলো মরে গিয়ে জন্ম নেয় এক ধূসর ও ভোঁতা ক্লান্তি। তখন আর কিছুতেই তেমন আনন্দ হয় না, আবার বড় কোনো ক্ষতিতেও তেমন কান্না আসে না। সব অনুভূতির ওপর যেন এক পুরু ধুলোর আস্তরণ পড়ে যায়।
এই ক্লান্তি মানুষের রক্তের সাথে এমনভাবে মিশে যায় যে সে একসময় এটাকেই স্বাভাবিক জীবন বলে মেনে নেয়। ছুটির দিনেও তার কোথাও ঘুরতে যেতে ইচ্ছে করে না, প্রিয় গানটা শুনতেও ভালো লাগে না। সে কেবল অন্ধকার ঘরে পর্দা টেনে শুয়ে থাকতে চায়। কেউ কারণ জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দিতে পারে না, কারণ তার কাছে দেখানোর মতো কোনো দৃশ্যমান ক্ষত নেই।
আসলে মানুষ তো কেবল বড় শোকের আঘাতে ভাঙে না; প্রতিদিনের ছোট ছোট আপস, না-বলা অপমান এবং অর্থহীন শ্রমের ঘর্ষণে মানুষের ভেতরকার জীবনীশক্তি একটু একটু করে ক্ষয়ে যায়। লোহার ওপর যেমন নিঃশব্দে মরচে পড়ে তাকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়, অভ্যাসে রূপ নেওয়া এই ক্লান্তিও মানুষকে ঠিক তেমনি এক জীবন্ত জীবাশ্মে পরিণত করে।