অধ্যায় ০২যে চিঠি কোনোদিন ডাকে দেওয়া হয়নি
ড্রয়ারের ভেতর হলুদ হয়ে যাওয়া খামের দীর্ঘশ্বাস
মাঝরাতে চিঠি লিখতে বসলে আঙুলের ডগাগুলো অকারণেই ঠান্ডা হয়ে আসে। টেবিল ল্যাম্পের মৃদু আলোয় সাদা কাগজের ওপর যখন প্রথমবার কারো নাম লেখা হয়, তখন পেটের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা মোচড় দিয়ে ওঠে। মানুষ তখন আর কোনো ভণিতা করে না; সে তার সমস্ত আত্মসম্মান এবং অহংকার খুলে রেখে একদম নগ্ন হাতে নিজের কাঁচা ক্ষতগুলো কাগজের ওপর বিছিয়ে দেয়।
আমাদের প্রত্যেকের ঘরেই এমন কিছু গোপন ড্রয়ার বা ফোনের নোটপ্যাড আছে, যেখানে কেবল না-পাঠানো চিঠির কঙ্কাল জমে থাকে। লেখার সময় মনে হয়, এই চিঠিটা না পাঠালে আজ রাতেই হয়তো দম আটকে মরে যেতে হবে। প্রতিটি অক্ষরে তখন রক্তক্ষরণ হয়, প্রতিটি দাঁড়ির পাশে জমে থাকে দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, চিঠিটা লেখা শেষ হওয়ার ঠিক পরমুহূর্তেই মানুষের ভেতরকার সেই পাগলামিটা হঠাৎ থেমে যায়। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে তার ভেতরের বাস্তববাদী ও ভীরু মানুষটা আবার জেগে ওঠে।
সে তখন ঠান্ডা মাথায় কল্পনা করে নেয়, চিঠিটা পাওয়ার পর ওপাশের মানুষটির মুখে কী প্রতিক্রিয়া হবে। হয়তো সে একটু হাসবে, হয়তো বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে ফোনটা পাশে সরিয়ে রাখবে, কিংবা করুণা করে দুই লাইনের একটা সৌজন্যমূলক উত্তর দেবে। নিজের সবচেয়ে পবিত্র কান্নাটুকুকে অন্যের করুণা বা কৌতূহলের বস্তু বানানোর চেয়ে তাকে নিজের হাতে গলা টিপে মেরে ফেলা অনেক বেশি সম্মানের মনে হয়। তাই চিঠিটা আর ডাকে দেওয়া হয় না। সেটি ভাঁজ হয়ে ঢুকে পড়ে পুরনো কোনো বইয়ের ভেতর কিংবা মুছে যায় স্ক্রিনের একটি ক্লিকে।
বছরের পর বছর কেটে যায়। একদিন হঠাৎ ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে যখন সেই হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজটা হাতে পড়ে, তখন মানুষ নিজেই চমকে ওঠে। যাকে উদ্দেশ্য করে অতগুলো আকুল কথা লেখা হয়েছিল, সে আজ কোথায় কে জানে। তার মুখটাও আজ আর স্পষ্ট মনে পড়ে না। অথচ কাগজের ওপর শুকিয়ে থাকা সেই অক্ষরগুলোর দিকে তাকালে আজও বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। আমরা তখন বুঝতে পারি, না-পাঠানো চিঠিগুলো আসলে অন্য কাউকে লেখা হয় না; ওগুলো মানুষ লেখে তার নিজেরই ফেলে আসা নিঃসঙ্গ যৌবনকে। প্রাপকের হাতে পৌঁছায়নি বলেই চিঠিগুলো আজও এতটা জীবন্ত রয়ে গেছে।