অধ্যায় ০৮অসমাপ্ত কথোপকথনের প্রতিধ্বনি
শেষ না হওয়া এক আলাপ, যা মানুষ সারাজীবন মনে মনে চালিয়ে যায়
গোসলখানায় শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় কিংবা বাসের জানলায় মাথা ঠেকিয়ে হঠাৎ খেয়াল হয়, আমরা নিজের মনেই বিড়বিড় করে কথা বলছি। ঠোঁট দুটো নড়ছে, ভ্রু কুঁচকে যাচ্ছে, আর আমরা এমন একজন মানুষের সাথে তর্ক করে চলেছি যে আজ আর আমাদের জীবনে নেই। হুঁশ ফিরলে চারপাশে তাকিয়ে নিজের ওপরই লজ্জা লাগে, অথচ বুকের ভেতরকার সেই অস্থিরতাটুকু কিছুতেই থামে না।
জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলো আমাদের জীবন থেকে চলে যায় কোনো এক অসমাপ্ত বাক্যের মাঝখানে। সিনেমায় বা উপন্যাসে বিদায়ের দৃশ্যগুলো কত সুন্দর ও গোছানো হয়! সেখানে মানুষ শেষ কথাটি বলার সুযোগ পায়। কিন্তু বাস্তব জীবনে বিচ্ছেদ ঘটে অত্যন্ত কদর্য ও আকস্মিকভাবে। হয়তো রাগের মাথায় কেউ ফোনটা কেটে দিয়েছিল, হয়তো কেউ বলেছিল, পরে কথা বলব। আমরা জানতামও না যে ওই পরে কথা বলব বাক্যটির পরেই নেমে আসবে আজীবনের নিস্তব্ধতা।
কথা তো শেষ হলো না, কিন্তু মানুষটা হারিয়ে গেল। তখন আমাদের মস্তিষ্ক শুরু করে এক নিষ্ঠুর খেলা। যে কথাগুলো সেদিন বলা হয়নি, যে অপমানের জবাব সেদিন ঠিক সময়ে মুখ দিয়ে বেরোয়নি, কিংবা যে ক্ষমাটুকু সেদিন চাওয়া হয়ে ওঠেনি, আমরা বছরভর আমাদের মাথার ভেতর সেই সংলাপগুলো সাজাতে থাকি। আমরা কল্পনায় সেই মানুষটিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাই, তাকে প্রশ্ন করি, আবার নিজেরাই তার হয়ে উত্তর তৈরি করি।
এই একতরফা কথোপকথনের কোনো শেষ নেই। মানুষ যতই নতুন জীবনে প্রবেশ করুক, তার অবচেতনের এক কোণে ওই পুরনো রেকর্ডটা অনবরত বাজতেই থাকে। কেন আমরা ওই অসমাপ্ত আলাপটা থামাতে পারি না? কারণ আমাদের মন জানে, যেদিন ওই কাল্পনিক কথোপকথনটুকু পুরোপুরি থেমে যাবে, সেদিনই মানুষটা আমাদের ভেতর থেকে সত্যিকারের অর্থে মারা যাবে। অসমাপ্ত কথাগুলো আসলে আমাদের মনের আধভেজানো দরজা; আমরা জানি ওপাশ থেকে কেউ আর ফিরবে না, তবু দরজাটায় খিল দিতে আমাদের হাত কাঁপে।