অধ্যায় ২৮শেষবার দেখার দিনেও না-বলা কথা
জানতাম এটাই হয়তো শেষ সাক্ষাৎ, তবুও স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করে বিদায় নেওয়া
হাসপাতালের কেবিনের দরজাটা ভিড়িয়ে বেরিয়ে আসার সময় কিংবা স্টেশনে ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে যখন পেছন ফিরে তাকানো হয়, তখন বুকের ভেতর কেউ যেন ফিসফিস করে বলে দেয়, ভালো করে দেখে নে, এই মুখটা আর কোনোদিন জীবিত দেখতে পাবি না। গলার কাছটা তখন দলা পাকিয়ে ওঠে, চোখ ফেটে জল আসতে চায়, অথচ আমরা কী অদ্ভুত নিষ্ঠুরতার সাথে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে হাত নেড়ে বলি, তাহলে আজ আসি, পরে আবার দেখা হবে।
মানুষের মন বড় অদ্ভুত। সে যখন স্পষ্ট বুঝতে পারে বিদায়ের ঘণ্টা বেজে গেছে, তখনো সে সেই চরম সত্যটাকে স্বীকার করতে ভয় পায়। আমরা ভাবি, আজ যদি আমি কেঁদে ফেলি, আজ যদি তার হাতটা জড়িয়ে ধরে বলি যে তোমাকে ছাড়া আমার চলবে না, তবে মানুষটা হয়তো ভয় পেয়ে যাবে, কিংবা এই শেষ বিদায়ের মুহূর্তটা বড় বেশি নাটকীয় হয়ে উঠবে। তাই আমরা এক চরম কাপুরুষের মতো স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করি।
আমরা তখন খুব তুচ্ছ সব কথা বলি: ওষুধটা সময়মতো খেয়ো, পথে সাবধানে যেয়ো, পৌঁছে একটা ফোন দিয়ো। অথচ আমাদের বুকের ভেতর তখন তোলপাড় করছে হাজারটা না-বলা কথা। বলতে ইচ্ছে করছে, আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো, তোমাকে যতটা ভালোবাসি তা কোনোদিন মুখ ফুটে বলা হয়নি। কিন্তু সেই আসল কথাগুলো গলার ভেতরেই আটকে থাকে, আর বাইরে বেরিয়ে আসে কেবলই কিছু কেজো ও অর্থহীন শব্দ।
তারপর সত্যিই একদিন সেই মানুষটি আর ফেরে না। তখন সারাজীবন ধরে নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে। মনে হয়, কেন সেদিন লোকলজ্জার ভয় করেছিলাম? কেন সেদিন শেষবারের মতো তাকে বুকের সাথে মিশিয়ে ধরে একটু কাঁদিনি? শেষ দেখার দিনের সেই স্বাভাবিক থাকার অভিনয়টুকু আজীবন বুকের ভেতর এক জ্বলন্ত অঙ্গার হয়ে বিঁধে থাকে।