পর্ব ১: হেমন্তের পাণ্ডুলিপি ও অব্যক্ত প্রেম

অধ্যায় ০৩সমান্তরাল রেললাইন ও অদেখা স্টেশন

পাশাপাশি ছুটে চলা অথচ আজীবন স্পর্শহীন থাকা

৪ মিনিট পাঠ

পাশাপাশি হাঁটতে থাকা দুজন মানুষের হাতের আঙুল যখন হঠাৎ ভুল করে একে অপরকে ছুঁয়ে ফেলে, তখন শরীরে যে সূক্ষ্ম বিদ্যুতের মতো ঝাঁকুনি লাগে, তার চেয়ে করুণ কিছু আর নেই। সাথে সাথে দুজনেই সংকুচিত হয়ে হাত সরিয়ে নেয়, মেকি হেসে অন্য কথা পাড়ে, অথচ দুজনেরই গলার স্বর তখন সামান্য কেঁপে ওঠে। এই যে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়, কিন্তু ছোঁয়ার কোনো অধিকার নেই, এই দূরত্বটুকুই মানুষকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়।

রেললাইনের দুটি লোহার পাতের দিকে তাকালে ঠিক এই মানুষগুলোর কথা মনে পড়ে। তারা জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি পাশাপাশি শুয়ে থাকে। একই শ্রাবণের বৃষ্টিতে ভেজে, একই চৈত্রের রোদে পুড়ে তামাটে হয়, একই ট্রেনের নিচে পিষ্ট হয়ে থরথর করে কাঁপে, অথচ কোনোদিন একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে পারে না। দূরে দিগন্তের দিকে তাকালে মনে হয় তারা বুঝি কুয়াশার ভেতর কোথাও গিয়ে এক হয়ে গেছে। কিন্তু কাছে গেলেই দেখা যায়, তাদের মাঝখানের ওই কয়েক ফুটের ব্যবধানটুকু চিরন্তন ও নিষ্ঠুর।

মানুষের জীবনেও কিছু সম্পর্ক আসে ঠিক এমন সমান্তরাল রেললাইনের মতো। হয়তো তারা খুব ভালো বন্ধু, হয়তো সহকর্মী, কিংবা এমন দুজন মানুষ যাদের দেখা হওয়ার আগেই জীবনের সব ঘরবসতি অন্য কোথাও বাঁধা হয়ে গেছে। তারা একে অপরের চোখের নিচের কালিটুকু সবার আগে দেখতে পায়। কার মন খারাপ হলে অন্যজনের গলা দিয়ে ভাত নামে না। অথচ সামাজিক নিয়মের লোহার পেরেক তাদের এমনভাবে মাটির সাথে গেঁথে রেখেছে যে, কেউ কারো দিকে এক ইঞ্চিও ঝুঁকে পড়তে পারে না।

তারা মনে মনে এক অদেখা স্টেশনের স্বপ্ন দেখে। ভাবে, পৃথিবীর সব দায়বদ্ধতা ফুরিয়ে গেলে হয়তো এমন কোনো নির্জন প্রান্তর আসবে, যেখানে কোনো পরিচয়ের তকমা ছাড়াই তারা পাশাপাশি বসতে পারবে। বাস্তবে সেই স্টেশন কোনোদিন আসে না। তবু এই যে কোনো দাবি না রেখে, কোনো অধিকার না চেয়ে কেবল সমান্তরালভাবে আজীবন পাশে থেকে যাওয়া, এ এক অদ্ভুত তপস্যা। রেললাইন দুটি কোনোদিন মেলে না বলেই তো তাদের ওপর দিয়ে জীবনের ভারী ট্রেনটা নির্বিঘ্নে ছুটে চলতে পারে। মিলন মানেই তো সেখানে পথের সমাপ্তি।