অধ্যায় ২৩বাবার পুরোনো চশমা ও ক্ষয়ে যাওয়া জুতো
যে বাবার ত্যাগ কোনোদিন চোখে পড়েনি, বয়স বাড়ার পর তার শূন্যতার ওজন বোঝা
আলমারির কোণে পড়ে থাকা বাবার পুরোনো চশমাটা হাতে নিলে দেখা যায় তার ডাঁটিটা কালো সুতো দিয়ে বাঁধা ছিল, আর নাকের কাছে সবুজ রঙের ছত্রাক জমে গেছে। বারান্দার এক কোণে পড়ে থাকা তার জুতোর তলাটা যে একপাশে ক্ষয়ে পাতলা কাগজের মতো হয়ে গিয়েছিল, বাবা বেঁচে থাকতে তা কোনোদিন আমাদের চোখেই পড়েনি। আজ নিজে যখন সংসারের বোঝা কাঁধে নিয়ে রাস্তায় নামি, তখন হঠাৎ জুতোর ভেতর পা পিছলে গেলে বাবার সেই ক্ষয়ে যাওয়া গোড়ালির ব্যথাটা নিজের পায়ে এসে লাগে।
মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবারা বড় অদ্ভুত এক প্রাণী। তারা ভালোবাসার কথা মুখ ফুটে বলতে জানে না। তাদের স্নেহ প্রকাশ পায় বাজারের সেরা মাছের টুকরোটা সন্তানের পাতে তুলে দেওয়ার ভেতর, কিংবা ঈদের সময় নিজের জন্য জামা না কিনে, আমার তো গত বছরেরটাই নতুন আছে, বলার নিখুঁত মিথ্যার ভেতর। কৈশোরে ও যৌবনে আমরা বাবাকে ভাবতাম আমাদের স্বাধীনতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা, এক রাশভারী শাসক। তার সাথে আমাদের কথা হতো মেপে মেপে, কেবল প্রয়োজনের তাগিদে।
কিন্তু বয়স যখন ত্রিশ পেরোয়, যখন মাসের শেষে বাড়িভাড়া আর ওষুধের বিলের হিসাব মেলাতে গিয়ে রাতের ঘুম উবে যায়, তখন হঠাৎ অন্ধকারে বাবার মুখটা মনে পড়ে। আমরা তখন বুঝতে পারি, যে মানুষটাকে আমরা এতদিন পাথর ভেবে এসেছি, সে আসলে আমাদের আড়াল করার জন্য নিজের বুক পেতে সমস্ত ঝড় সহ্য করেছিল। তার পকেটে কত টাকা থাকত, তার কখনো কোনো শখ ছিল কি না, তা আমরা কোনোদিন জানতেও চাইনি।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, পুরুষ মানুষ যখন তার বাবার এই নিঃশব্দ ত্যাগের ওজনটুকু বুঝতে শেখে, ততদিনে বাবা হয় মাটির নিচে চলে গেছেন, নয়তো বার্ধক্যের ভারে কুঁজো হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন। তখন তার হাতটা ধরে বলতে ইচ্ছে করে, বাবা, আমি সব বুঝেছি। কিন্তু গলার কাছে কী যেন একটা আটকে যায়, চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে ওঠে, অথচ শেষ পর্যন্ত কথাটা আর কোনোদিন বলা হয়ে ওঠে না।