অধ্যায় ২৭পরিবারের কালো ভেড়া
পরিবারের ছাঁচে নিজেকে মেলাতে না পেরে আজীবন একা ও নিন্দিত হয়ে বেঁচে থাকা
পাশের ঘরের দরজাটা সামান্য ভেজানো থাকলে ভেতর থেকে মা-বাবার বা আত্মীয়স্বজনের ফিসফিসানি কানে আসে, আর নিজের নামটা শুনলেই কান দুটো গরম হয়ে ওঠে। খাবার টেবিলে যখন সবাই সবার সাফল্যের গল্প করে, তখন একটি মানুষ চুপচাপ মাথা নিচু করে পাতের ভাত নাড়াচাড়া করে আর ভাবে, কখন এই খাওয়াটুকু শেষ হবে এবং সে নিজের ঘরের অন্ধকারে গিয়ে লুকাতে পারবে।
প্রতিটি পরিবারেই একটি নির্দিষ্ট ছাঁচ থাকে। কোন বিষয়ে পড়তে হবে, কত টাকা আয় করতে হবে, কোন বয়সে বিয়ে করতে হবে এবং কীভাবে কথা বলতে হবে, তার সব নিয়ম আগে থেকেই লেখা থাকে। কিন্তু মাঝেমধ্যে কোনো কোনো পরিবারে এমন একজন মানুষের জন্ম হয়, যে কিছুতেই নিজেকে ওই রেডিমেড ছাঁচের ভেতর আঁটাতে পারে না। সে হয়তো টাকার চেয়ে কবিতাকে বেশি ভালোবেসে ফেলে, কিংবা সে হয়তো সবার মতো চাতুরী করে উপরে উঠতে জানে না। অমনি পুরো পরিবার তাকে একঘরে করে দেয়; তার নাম হয়ে যায় পরিবারের কলঙ্ক বা কালো ভেড়া।
বাইরের মানুষের অবহেলা সহ্য করা সহজ, কিন্তু নিজের রক্তের মানুষদের চোখের করুণা ও তাচ্ছিল্য সহ্য করা নরকযন্ত্রণার সমান। এই মানুষগুলো সারাজীবন এক প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভোগে। তারা ভাবে, আমি কেন সবার মতো স্বাভাবিক হতে পারলাম না? মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাতে না পারার গ্লানি তাদের কুরে কুরে খায়, অথচ নিজের আত্মাকে হত্যা করে সমাজের ছাঁচে ঢুকে পড়ার ক্ষমতাও তাদের থাকে না।
তাই তারা ধীরে ধীরে পরিবারের কেন্দ্র থেকে ছিটকে প্রান্তে চলে যায়। উৎসবে-অনুষ্ঠানে তারা থাকে সবার পেছনের সারিতে। সবাই তাদের ব্যর্থ ভাবে, অকর্মণ্য ভাবে। কেউ কোনোদিন জানার চেষ্টাও করে না, নিজের পরিবারের ভেতর পরবাসী হয়ে বেঁচে থাকার জন্য একজন মানুষকে প্রতিদিন কতটা নীরব রক্তক্ষরণের ভেতর দিয়ে যেতে হয়।