পর্ব ২: নাগরিক ক্লান্তি, মুখোশ ও নীল আলোর ফাঁদ

অধ্যায় ২২ঘরের ভেতর অচেনা আয়না

বাথরুমের আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকেই আগন্তুক মনে হওয়া

৪ মিনিট পাঠ

রাতে দাঁত ব্রাশ করার সময় বাথরুমের সাদা টিউবলাইটের নিচে হঠাৎ আয়নার দিকে চোখ পড়লে হাতটা থমকে যায়। কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির চোখের নিচে কালো গর্ত, গালের চামড়ায় ক্লান্তির ভাঁজ আর চোখের মণিতে এক রাজ্যের শূন্যতা। একদৃষ্টে কয়েক সেকেন্ড ওই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলে হঠাৎ বুকটা কেঁপে ওঠে; মনে হয়, কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই অচেনা লোকটা কে?

শৈশবে বা কৈশোরে আমরা যে মানুষটা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমাদের চোখের ভেতর যে উজ্জ্বল কৌতূহল ছিল, তা কবে এবং কোন রাস্তায় হারিয়ে গেছে তা আমরা নিজেরাও জানি না। সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে, সমাজের মাপে নিজেকে ফিট করতে গিয়ে আমরা নিজেদের অজান্তেই প্রতিদিন নিজেদের একটু একটু করে কেটে ছেঁটে ফেলেছি। আজ মধ্যবয়সের বা যৌবনের এই বাঁকে এসে দেখা যাচ্ছে, মূল মানুষটির আর কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট নেই।

আয়নার সামনের এই মানুষটি বড় হিসেবি, বড় ভীরু। সে অন্যায় দেখে চুপ করে থাকতে শিখেছে, সে সুবিধা পাওয়ার জন্য অপছন্দের মানুষের সাথেও হাসিমুখে হাত মেলাতে শিখেছে। কাঁচের ওপাশের সেই পরাজিত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকলে নিজের ওপরই এক তীব্র করুণা ও ঘৃণা জন্ম নেয়। ইচ্ছে করে আয়নাটা ভেঙে ফেলতে, কিংবা ওই মানুষটার কলার চেপে ধরে জিজ্ঞেস করতে, তুই আমার সেই পুরনো আমিটাকে কোথায় গুম করেছিস?কিন্তু আমরা কিছুই করি না। মুখের ফেনা ধুয়ে ফেলে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছি, তারপর বাথরুমের আলোটা নিভিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসি। অন্ধকারেই স্বস্তি। কারণ আলো জ্বললেই তো আবার ওই অচেনা আগন্তুকের চোখের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, যে আমাদেরই শরীর দখল করে আমাদের দিকেই নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে।