অধ্যায় ১৮শক্ত মানুষের একলা কাঁদার অধিকার
যে মানুষটা সবাইকে আগলে রাখে, দিনশেষে তার চোখের জল মোছানোর কেউ থাকে না
প্রতিটি পরিবারে বা বন্ধুবৃত্তে এমন একজন মানুষ থাকে, যাকে সবাই পাহাড় বলে মনে করে। কারো বিপদ হলে সবার আগে তার কথাই মনে পড়ে, কারো মন খারাপ হলে তার কাঁধেই মাথা রেখে সবাই কাঁদে। কিন্তু এই পাহাড়ের মতো মানুষটির বুকের ভেতর যখন ধস নামে, তখন তার সামনে দাঁড়ানোর মতো একটি মানুষও খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ সবাই ধরেই নিয়েছে, এই মানুষটির কোনো কষ্ট থাকতে নেই, এর কোনো ভাঙ্গার অধিকার নেই।
শক্ত হওয়ার এই তকমাটা মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। শৈশব বা কৈশোর থেকে যে মানুষটি পরিস্থিতির চাপে নিজের কান্না লুকিয়ে অন্যদের সামলাতে শিখেছে, সমাজ তাকে চিরকালের জন্য এক অবৈতনিক ত্রাণকর্তা বানিয়ে দেয়। সে যদি কখনো ভুল করে নিজের ক্লান্তির কথা বলতে যায়, তবে অন্যরা অবাক হয়ে বলে, তুমিও ভেঙে পড়ছ? তুমি ভেঙে পড়লে আমাদের কী হবে? এই একটিমাত্র প্রশ্নে তার মুখের কথা মুখেই মরে যায়।
তাই শক্ত মানুষদের কাঁদার জন্য কোনো কাঁধ বরাদ্দ থাকে না। তাদের কাঁদতে হয় মাঝরাতে বাথরুমের কল ছেড়ে দিয়ে, যাতে জলের শব্দে তাদের ফোঁপানির শব্দ ঢাকা পড়ে যায়। তাদের কাঁদতে হয় দাঁতে দাঁত চেপে, বালিশের কোণা কামড়ে ধরে, যাতে পাশের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা প্রিয়জনদের ঘুমের কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। কান্নার দমকে তাদের বুক ফেটে যেতে চায়, গলার রগগুলো ফুলে ওঠে, তবু গলা দিয়ে একটি টু শব্দও বেরোতে দেওয়া যায় না।
সকাল হলেই এই মানুষগুলো আবার চোখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিয়ে আগের মতো শক্ত হয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে। সবাই তাদের দেখে আশ্বস্ত হয়। কেউ কোনোদিন খেয়ালও করে না, যে মানুষটি সবাইকে ছায়া দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে, তার নিজের শিকড়টুকুই ভেতর থেকে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।