অধ্যায় ০৫স্পর্শের চেয়েও গভীর যে দূরত্ব
এক বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে থেকেও আলোকবর্ষ দূরত্বের জন্ম হওয়া
রাত বারোটার পর ঘরের বাতাস যখন ভারী হয়ে ওঠে, তখন পাশের মানুষটির নিঃশ্বাসের শব্দও কানে হাতুড়ির মতো বাজে। একই তোশকের ওপর মাত্র ছয় ইঞ্চি ব্যবধানে দুটি শরীর পাশাপাশি শুয়ে আছে, অথচ কারো হাত কারো শরীর ছুঁয়ে দেখার সাহস পাচ্ছে না। পিঠের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে শুয়ে থাকা এই দুটি মানুষের মাঝখানে যে হিমশীতল মরুভূমি শুয়ে আছে, তা পার হতে গেলে কয়েক জনম লেগে যাবে।
দূরত্ব বলতে আমরা কেবল মাইল বা কিলোমিটারের হিসাব বুঝি। আমরা ভাবি, যে মানুষটা চোখের সামনে আছে, সে বুঝি আমাদের কাছেই আছে। কী হাস্যকর ভ্রান্তি আমাদের! পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর দূরত্ব তৈরি হয় তখনই, যখন দুটি শরীরের মাঝখানে আর এক চুলও ফাঁকা জায়গা থাকে না। বাইরের লোক দেখে একটি নিটোল সংসার, দেখে ছুটির দিনে একসাথে বাজারে যাওয়া, দেখে পারিবারিক অনুষ্ঠানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তোলা হাসিমুখের ছবি। কিন্তু শোবার ঘরের দরজা বন্ধ হলেই সেই হাসির মুখোশটা খসে পড়ে মেঝের ওপর।
কোনো সম্পর্কই একদিনে মরে না। তার মৃত্যু ঘটে প্রতিদিন একটু একটু করে, অত্যন্ত নিঃশব্দে। শুরুতে হয়তো ছোট্ট কোনো অভিমান ছিল। একজন ভেবেছিল অন্যজন বুঝবে, কিন্তু সে বোঝেনি। তারপর একদিন ঝগড়া করার ইচ্ছেটুকুও মরে গেল। মানুষ যখন কাউকে নিয়ে অভিযোগ করা বন্ধ করে দেয়, তখন বুঝতে হবে সেখানে আর ভালোবাসার কোনো অবশিষ্ট নেই। কথার জায়গায় তখন জায়গা করে নেয় কেবল প্রয়োজনীয় কিছু শব্দ: খেয়েছ? বাজার এনেছ? আলোটা নিভিয়ে দাও।
অচেনা মানুষের সাথে দূরত্ব থাকলে বুকে বাজে না। কিন্তু যে মানুষটির শরীরের প্রতিটি তিল চেনা, যার গলার স্বরের প্রতিটি ওঠানামা একসময় মুখস্থ ছিল, সে যখন একই ছাদের নিচে থেকে যোজন যোজন দূরে চলে যায়, তখন মানুষের দম বন্ধ হয়ে আসে। অন্ধকারে শুয়ে ছাদের সিলিং ফ্যানের ঘূর্ণন দেখতে দেখতে তখন মনে হয়, একা থাকাটা অতটা কষ্টের নয়; কিন্তু ভুল মানুষের সাথে এক বিছানায় একা হয়ে যাওয়ার চেয়ে বড় নরক পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই।